নিউজ ডেস্ক: দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে বিছানায় নিথর দেহ, দু’চোখে শুধুই শূন্যতা। ছেলের এই অসহ্য যন্ত্রণা আর সহ্য করতে পারছিলেন না বৃদ্ধ বাবা-মা। অবশেষে তাঁদের আবেদনে সাড়া দিয়ে ‘মর্যাদার সঙ্গে মৃত্যুর অধিকার’ (Euthanasia) নিয়ে এক ঐতিহাসিক রায় দিল সুপ্রিম কোর্ট। ২০১৩ সাল থেকে ‘কোমা’ বা স্থায়ীভাবে অচেতন অবস্থায় থাকা যুবক হরিশ রানার লাইফ সাপোর্ট তথা জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা বন্ধ করার অনুমতি দিল শীর্ষ আদালত। এই রায়ের ফলে দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এক অসম লড়াইয়ের যবনিকা পড়ল।
স্বপ্নিল ছাত্র থেকে ‘জীবন্ত মৃত’: হরিশ রানা ছিলেন চণ্ডীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মেধাবী ছাত্র। ২০১৩ সালে রাখির দিন একটি পেইং গেস্ট আবাসনের চার তলার বারান্দা থেকে পড়ে গিয়ে মাথায় গুরুতর চোট পান তিনি। সেই থেকেই তিনি ‘পার্সিস্টেন্ট ভেজিটেটিভ স্টেট’-এ আচ্ছন্ন। চিকিৎসকদের রিপোর্ট অনুযায়ী, গত ১৩ বছরে তাঁর শারীরিক অবস্থার কোনও উন্নতি হয়নি। কেবল কৃত্রিম উপায়ে লাইফ সাপোর্টের মাধ্যমেই টিকে ছিল তাঁর প্রাণবায়ু।
আইনি জট ও ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ: বিচারপতি জে বি পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি কে ভি বিশ্বনাথনের বেঞ্চ বুধবার এই রায় ঘোষণা করেন। ২০১৮ সালের ঐতিহাসিক ‘কমন কজ’ মামলায় সুপ্রিম কোর্ট নিষ্কৃতি মৃত্যুকে স্বীকৃতি দিলেও কিছু পদ্ধতিগত ধোঁয়াশা ছিল। বিশেষ করে ‘ফিডিং টিউব’-এর মাধ্যমে খাবার দেওয়া বন্ধ করা যাবে কি না, তা স্পষ্ট ছিল না। এদিনের রায়ে আদালত সাফ জানাল, হাসপাতালে রোগীকে যে কৃত্রিম পুষ্টি (CAN) দেওয়া হয়, সেটিও চিকিৎসারই অংশ। তাই মেডিকেল বোর্ডের সম্মতিতে তা প্রত্যাহার করা আইনত বৈধ।
মর্যাদার সঙ্গে বিদায়: শীর্ষ আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে, জীবনের মতোই মর্যাদার সঙ্গে মৃত্যুও সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ। রায় দিতে গিয়ে বিচারপতিরা বলেন, “জীবন দীর্ঘায়িত করার জন্য যে চিকিৎসা চলছে, তা কি আদেও রোগীর উপকারে লাগছে? নাকি কেবল কৃত্রিমভাবে তাঁর আয়ুকে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে?” আদালত মনে করে, রোগীর ‘সর্বোত্তম স্বার্থ’ বিচার করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আইনজ্ঞদের মতে, এই রায় ভবিষ্যতে এই ধরণের জটিল মামলার ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করবে। ১৩ বছরের দীর্ঘ লড়াই শেষে হরিশের বাবা-মার কাছে এই রায় শোকের আবহেও এক ধরণের মুক্তি নিয়ে এল।