নিজস্ব সংবাদদাতা, রায়না: মাটির দেওয়াল আর অ্যাসবেস্টসের চাল দেওয়া দু’কুঠুরির ঘর। বর্ষায় জল পড়ে, শীতে হাড়কাঁপানো ঠান্ডা। কিন্তু সেই ভাঙা ঘরেই সযত্নে লালিত হচ্ছিল এক আকাশছোঁয়া স্বপ্ন। অভাবের সঙ্গে নিত্যদিনের লড়াই, কখনও খালি পেটে অনুশীলন, তো কখনও মাইলের পর মাইল পথ চলা— কোনও কিছুই থামাতে পারেনি তাঁর জেদ। অবশেষে সেই কঠোর পরিশ্রমের ফল পেলেন পূর্ব বর্ধমানের রায়নার প্রত্যন্ত বাঁশা গ্রামের তরুণ পেসার সৌমেন চট্টোপাধ্যায়। আসন্ন আইপিএলে (IPL) রাজস্থান রয়্যালস (Rajasthan Royals) শিবিরের ‘নেট বোলার’ হিসেবে ডাক পেয়েছেন তিনি।
রায়নার পলাশন গ্রাম পঞ্চায়েতের এই বাঁশা গ্রাম থেকেই সৌমেনের ক্রিকেটের রূপকথা শুরু। বাবা সঞ্জয় চট্টোপাধ্যায় পেশায় ট্র্যাক্টর চালক, পাশাপাশি গ্রামে পূজা-পার্বণও করেন। অভাবের সংসারে একমাত্র সন্তানের ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসাকে সম্বল করেই বেঁচে থাকা। স্থানীয় শাকনাড়া হাই স্কুল থেকে পড়াশোনা শেষ করে সৌমেন বর্তমানে কলকাতার ভবানীপুর কলেজের বি.এ দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। তবে বইয়ের পাতার চেয়েও তাঁর ধ্যান-জ্ঞান জুড়ে শুধুই বাইশ গজ।
সৌমেন জানান, শুরুতে গ্রামের বন্ধুদের সঙ্গে টেনিস বলেই হাতেখড়ি। ক্রমে ক্রিকেটের প্রতি আসক্তি বাড়ে। অভাবের কারণে অনেক সময় কলকাতায় অনুশীলন করতে গিয়ে খাওয়ার টাকাও জুটত না তাঁর। তবুও লড়াই থামাননি। গত ৫-৬ বছর দিল্লি ও মুম্বইয়ে পড়ে থেকে নিজেকে তৈরি করেছেন। বর্তমানে কলকাতার সুপার ডিভিশন ক্লাব ডালহৌসির হয়ে নিয়মিত খেলছেন তিনি। শোয়েব আখতার এবং জসপ্রীত বুমরাহ— এই দুই কিংবদন্তি ফাস্ট বোলারই সৌমেনের আদর্শ। বর্তমানে তাঁর বোলিং গতি ১৪০ কিমি/ঘণ্টা ছুঁইছুঁই।
সম্প্রতি ওড়িশার ভুবনেশ্বরে রাজস্থান রয়্যালসের স্পনসর সংস্থার পক্ষ থেকে একটি ট্রায়াল ক্যাম্পের আয়োজন করা হয়েছিল। দেশজুড়ে হওয়া সেই বাছাই প্রক্রিয়া থেকে মাত্র ৩ জনকে নেট বোলার হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম নাম এই সৌমেন। আগামী ১৬ মার্চ তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ফ্র্যাঞ্চাইজি দলটিতে যোগ দেবেন। সৌমেনের কথায়, “নেট বোলার হিসেবে সুযোগ পেয়ে অনেকেই আজ জাতীয় দলে খেলছেন। আমার লক্ষ্যও কঠোর পরিশ্রম করে ভারতের জার্সি গায়ে মাঠে নামা। কোচ এবং পরিবারের সহযোগিতা ছাড়া আমি এই জায়গায় পৌঁছাতে পারতাম না।”
ছেলের এই সাফল্যে খুশির হাওয়া রায়নার বাঁশা গ্রামে। গর্বিত বাবা সঞ্জয় বাবু বলেন, “আমি ছেলেকে বলেছি বাড়ির চিন্তা না করতে। আমি ট্র্যাক্টর চালিয়ে বা কষ্ট করে হলেও ওর পাশে থাকব। আমি চাই ও নিজের খেলার মাধ্যমে বাংলাকে এবং দেশকে গর্বিত করুক।” মা শ্রাবণী দেবীও ছেলের এই দীর্ঘ লড়াইয়ের সার্থকতায় আবেগপ্লুত। আইপিএলের তারকাখচিত আঙিনায় সুযোগ পাওয়া সৌমেনের হাত ধরে এখন আগামীর সোনালী দিনের অপেক্ষায় তাঁর গ্রাম ও পরিবার।