নিউজ ডেস্ক: একদিকে তীব্র দাবদাহ, অন্যদিকে লোকসভা ভোটের দামামা— এই জোড়া ফলায় রাজ্যের ব্লাড ব্যাংকগুলিতে রক্তসংকট এখন চরমে। ঠিক এই ‘ইমার্জেন্সি’ পরিস্থিতিতেই রাজ্যের প্রধান সরকারি রক্তভাণ্ডার, মানিকতলা সেন্ট্রাল ব্লাড ব্যাংকের ৮১ জন চিকিৎসক ও কর্মীকে নির্বাচনের ডিউটিতে পাঠানোর নির্দেশ দিল কমিশন। এই তালিকায় রয়েছেন ৩৭ জন অভিজ্ঞ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, যাঁদের ছাড়া ব্লাড ব্যাংকের দৈনন্দিন কাজকর্ম কার্যত অসম্ভব। কমিশনের এই সিদ্ধান্তে রাজ্যজুড়ে রক্তদান আন্দোলনের কর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলাশাসক তথা রিটার্নিং অফিসারের অধীনে এই কর্মীদের ট্রেনিং ও নির্বাচনি কাজে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সূত্রের খবর, এই তালিকায় ডেপুটি ডিরেক্টর থেকে শুরু করে চিকিৎসক, স্টোরকিপার, পাবলিসিটি অফিসার এবং চতুর্থ শ্রেণির কর্মীরাও রয়েছেন। বাদ যায়নি এনআরএস-এর মতো শহরের অন্যান্য বড় সরকারি ব্লাড ব্যাংকও।
কেন এই সিদ্ধান্ত বিপজ্জনক?
মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা যে কোনও ব্লাড ব্যাংকের মেরুদণ্ড। তাঁদের অনুপস্থিতিতে যে সমস্যাগুলি তৈরি হতে পারে:
-
রক্ত সংগ্রহ ব্যাহত: রক্তদান শিবিরে গিয়ে রক্ত সংগ্রহ করা এবং দাতাদের প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
-
অপরিহার্য পরীক্ষা: সংগৃহীত রক্তে এইচআইভি (HIV), হেপাটাইটিস-বি ও সি-র মতো ৫টি প্রাণঘাতী পরীক্ষা থমকে যাবে।
-
ক্রস-ম্যাচিং বন্ধ: রোগীর শরীরের জন্য দাতার রক্ত উপযুক্ত কি না (Cross-matching), সেই পরীক্ষা করার লোক থাকবে না। ফলে মুমূর্ষু রোগীরা রক্ত পাবেন না।
-
উপাদান পৃথকীকরণ: রক্ত থেকে প্লাজমা বা প্লেটলেট আলাদা করার প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
জনস্বার্থে অব্যাহতির আবেদন:
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝে গত ২৪ মার্চ সেন্ট্রাল ব্লাড ব্যাংকের ডিরেক্টর ডাঃ পরমার্থ চট্টোপাধ্যায় দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলাশাসককে একটি জরুরি চিঠি পাঠিয়েছেন। ১৮ জন গুরুত্বপূর্ণ আধিকারিক ও কর্মীর একটি তালিকা পাঠিয়ে তিনি সাফ জানিয়েছেন, এদের মধ্যে অন্তত ১৫ জনকে ‘ক্যাননট বি স্পেয়ারেবল ফর পাবলিক ইন্টারেস্ট’ বা জনস্বার্থে কোনওভাবেই ছাড়া সম্ভব নয়। এই ১৫ জনের মধ্যে রয়েছেন ৯ জন টেকনোলজিস্ট এবং অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসাররা। চিঠিতে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে, গ্রীষ্মকালীন এই সময়টা ব্লাড ব্যাংকের জন্য এক প্রকার আপদকালীন পরিস্থিতি। এই সময় কর্মীদের সরিয়ে নিলে রক্ত সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়তে পারে।
কমিশনের প্রতিক্রিয়া:
রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (CEO) দপ্তরের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, যদি জেলাশাসক এই ডিউটি দিয়ে থাকেন, তবে ব্লাড ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে সেই জেলাশাসকের কাছেই বিষয়টির গুরুত্ব বুঝিয়ে আবেদন জানাতে হবে। তবে কমিশনের এই অনড় মনোভাবে রক্তসংকট আরও তলানিতে ঠেকার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এখন প্রশ্ন উঠছে, গণতান্ত্রিক উৎসব কি সাধারণ মানুষের চিকিৎসার নূন্যতম অধিকার কেড়ে নিয়ে পালিত হবে?