নিউজ ডেস্ক: ঘটনাটা যখন ঘটছে, ডুয়ার্সের এক জীর্ণ চা বাগানের ঘরে ১০ বছরের কিশোরী ভাবছিল, সে কি ঘুমিয়ে আছে? দিনের আলোয় কি স্বপ্ন দেখছে? কিন্তু না, ঘোর কাটতেই দেখল, ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকলেন এক মহিলা। তাঁর মা। মায়ের মুখটা ঠিক কেমন ছিল, আবছা মনে পড়ে কিশোরীর। কারণ, মাঝে বয়ে গিয়েছে দীর্ঘ সাতটা বছর। একটু স্বচ্ছল জীবনের খোঁজে মা হারিয়ে গিয়েছিলেন অতল অন্ধকারে। অবশেষে সোমবার, নিয়তির ফেরে আর মানবিকতার হাত ধরে ফিরে এলেন তিনি। মাকে দেখেই কান্নায় ভেঙে পড়ল কিশোরী। সাত বছরের জমে থাকা অভিমান আর এখনকার আনন্দ— সব যেন মিশে গেল মায়ের কোলের উষ্ণতায়।
সাত বছর আগের কথা। জলপাইগুড়ি জেলার মাল ব্লকের ডামডিম গ্রাম পঞ্চায়েতের বাসিন্দা ওই মহিলা এক পাচারকারী এজেন্টের খপ্পরে পড়েছিলেন। বেশি বেতনের কাজের প্রলোভনে পা দিয়ে দুধের শিশুকে ঘরে রেখেই পাড়ি দিয়েছিলেন গুজরাটে। সেখানে পৌঁছাতেই ভুল ভাঙে তাঁর। রঙিন দুনিয়ার আড়ালে যে এক অন্ধকার খাঁচায় তিনি বন্দি হয়েছেন, বুঝতে দেরি হয়নি। শুরু হয় অকথ্য অত্যাচার। নিয়মিত মানসিক ও শারীরিক যন্ত্রণায় একসময় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন তিনি। পাচারকারীদের কাছে ‘অকেজো’ হয়ে যাওয়ায় তাঁকে ফেলে দিয়ে আসা হয়েছিল আহমেদাবাদের রাস্তায়।
তারপরের সময়টুকু যেন ম্যাজিক। শহরের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘অল ট্যুইস্ট’ তাঁকে উদ্ধার করে। সংগঠনের কর্ণধার চিরাগ চৌধুরী মহিলার চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন মানসিক হাসপাতালে। দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা চলার পরে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন তিনি। স্মৃতি ফিরে এলে মনে পড়ে যায় ডুয়ার্সের জীর্ণ বাড়ির ঠিকানা, বাবা-দাদার নাম। চিরাগ মাল থানার মাধ্যমে ওই এলাকার এক পঞ্চায়েত সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। মহিলার পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার পর, সোমবার নিজে উদ্যোগী হয়ে মহিলাকে তাঁর পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
ডুয়ার্সের চা বাগানগুলি থেকে এভাবে মেয়েদের হঠাৎ হারিয়ে যাওয়া নতুন কিছুই নয়। প্রলোভনে পড়ে পাচার হয়ে যায় একের পর এক দরিদ্র পরিবারের মেয়েরা। অনেকে আর ফিরে আসতে পারেন না কোনওদিন। এদিন ডামডিমের সেই ঘরের সামনে উপচে পড়া ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। সাত বছর আগে যাঁকে ফিরে পাওয়ার সব আশা ছেড়ে দিয়েছিল পরিবার, তাঁকে হঠাৎ সামনে দেখে গলা বুজে আসছিল বাড়ির সকলের। এলাকার পঞ্চায়েত সদস্য বললেন, ‘আহমেদাবাদের ওই স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে ধন্যবাদ জানানোর ভাষা আমাদের নেই। তারা না থাকলে ঘরের মেয়ে কোনওদিন ফিরতে পারত না।’ ডুয়ার্সে না ফিরে আসা মেয়েদের ভিড়ে এই প্রত্যাবর্তন যেন একটু ভরসা বয়ে আনল, মানবিকতা জিতে যাওয়ার এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থেকে গেল দিনটা।