নিউজ ডেস্ক: ভারতীয় চিকিৎসা জগতের এক বর্ণময় এবং দীর্ঘতম অধ্যায়ের অবসান ঘটল। প্রয়াত হলেন প্রথিতযশা চিকিৎসক তথা পদ্মশ্রী মণি ছেত্রী। রবিবার রাত ১০টা ১৫ মিনিট নাগাদ কলকাতার বালিগঞ্জ ফাঁড়ির বাসভবনে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ১০৬ বছর। তাঁর মহাপ্রয়াণে বাংলার চিকিৎসক মহলে শোকের গভীর ছায়া নেমে এসেছে।
জীবনাবসানের নেপথ্যে
পারিবারিক সূত্রে জানা গিয়েছে, দিন পনেরো আগে বাড়িতে পড়ে গিয়ে মাথায় গুরুতর চোট পেয়েছিলেন তিনি। পরীক্ষার পর চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন, তাঁর ‘সাব ডুরাল হেমাটোমা’ হয়েছে। হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হওয়ায় দিন পাঁচেক আগে তাঁকে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়েছিল। কিন্তু রবিবার রাতে লড়াই শেষ হয় এই শতায়ু নক্ষত্রের।
দার্জিলিং থেকে লন্ডনের সফর
১৯২০ সালের ২৩ মে পাহাড়ের কোলে দার্জিলিংয়ে জন্ম মণি কুমার ছেত্রীর। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডাক্তারি পাশ করার পর তিনি লন্ডনে পাড়ি দিয়েছিলেন উচ্চশিক্ষার জন্য। এমডি ও এমআরসিপি ডিগ্রি অর্জনের পর দেশে ফিরে স্কুল অফ ট্রপিক্যাল মেডিসিনে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীকালে এসএসকেএম হাসপাতালের সার্জন-সুপারিনটেনডেন্ট এবং আইপিজিএমইআর-এর কার্ডিওলজি ও মেডিসিন বিভাগের প্রফেসর-ডিরেক্টর হিসেবে তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা ও শিক্ষকতা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চিকিৎসকদের অনুপ্রাণিত করেছে। ১৯৭৪ সালে চিকিৎসাশাস্ত্রে অসামান্য অবদানের জন্য ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করে।
‘রোগ চেনার জাদুকর’ ও এক অদম্য জীবনীশক্তি
চিকিৎসক মহলে তিনি পরিচিত ছিলেন রোগ নির্ণয়ের অসামান্য ক্ষমতার জন্য। বিশিষ্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাঃ সুকুমার মুখোপাধ্যায়ের কথায়, “এক বিরল প্রতিভাকে হারালাম। অসম্ভব ভালো রোগ বোঝার ক্ষমতা ছিল ওঁর।” অন্যদিকে, এক বেসরকারি হাসপাতালের শীর্ষকর্তা রূপক বড়ুয়া স্মৃতিচারণা করে জানান, নবতিপর অবস্থাতেও হাসপাতালে সিঁড়ি ভেঙেই ওঠানামা করতেন তিনি। রসিকতা করে ছাত্রদের বলতেন, তাঁর কোনও সুগার বা প্রেশারের সমস্যা নেই, তাই ‘উপরে যাওয়ার’ জন্য অন্তত একটা কিছু তো থাকতে হবে।
ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টর্স ফোরাম-সহ বিভিন্ন চিকিৎসা সংগঠন তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোকপ্রকাশ করেছে। সরকারি হাসপাতালের চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পরও তিনি নিরলসভাবে চিকিৎসা পরিষেবায় নিজেকে যুক্ত রেখেছিলেন। তাঁর প্রয়াণে বাংলার চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন হল।