নিউজ ডেস্ক: খাসতালুক থেকে নাম উধাও হওয়ার আতঙ্ক তাড়া করে বেড়াচ্ছে মেদিনীপুরের ঘাটাল মহকুমার কয়েক হাজার মানুষকে। ভোটার তালিকায় নিজের নামটুকু বজায় রাখতে এখন প্রাণান্তকর সংগ্রামে নেমেছেন সাধারণ মানুষ। ট্রাইব্যুনালে আবেদন করার জন্য আবশ্যিক ‘জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট’-এর হলফনামা বা এফিডেভিট জোগাড় করতে গিয়ে ঘাটাল আদালত চত্বরে তৈরি হয়েছে নজিরবিহীন দৃশ্য। কাকভোর নয়, রাত ১টা থেকেই আদালতের গেটের বাইরে লম্বা লাইন দিচ্ছেন শয়ে শয়ে মানুষ। উদ্দেশ্য একটাই— দিনের প্রথম ৫০ জনের তালিকায় নাম নথিভুক্ত করা।

রাত জাগছে ঘাটাল:

রাজ্যের সংশোধিত ভোটার তালিকা প্রকাশের পর থেকেই ঘাটাল মহকুমা জুড়ে শোরগোল পড়ে গিয়েছে। বৈধ ভোটার হওয়া সত্ত্বেও অনেকের নাম রহস্যজনকভাবে তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। সেই নাম ফেরাতে এখন ট্রাইব্যুনালের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে তাঁদের। আর সেই আইনি লড়াইয়ের প্রথম ধাপই হলো প্রথম শ্রেণির জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের হলফনামা সংগ্রহ।

ঘাটাল আদালতের গেটে বুধবার রাত ১টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন ঘাটাল থানার শিমুলিয়ার বাসিন্দা মইনুল ইসলাম। তাঁর কথায়, “আগে দু’দিন এসে ঘুরে গিয়েছি। এবার জায়গা ধরে রাখতে রাত থেকে জেগে দাঁড়িয়ে আছি।” একই অবস্থা দাসপুর থানার মাসুদা বিবির। ষাটোর্ধ্বো এই বৃদ্ধা রাত ২টোয় লাইনে দাঁড়িয়ে অবশেষে এদিন হলফনামা হাতে পেয়েছেন। তবে সবথেকে করুণ অবস্থা দাসপুরের টুম্পা মল্লিকের। দু’বছরের কোলের সন্তানকে নিয়ে রাত ৩টে থেকে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি, যাতে ভোটাধিকার ফিরে পাওয়ার শেষ সুযোগটুকু হাতছাড়া না হয়।

বিচারবিভাগীয় সীমাবদ্ধতা ও ভোগান্তি:

আদালত চত্বরে উপচে পড়া ভিড় থাকলেও কাজের গতি বাড়াতে পারছেন না কর্তৃপক্ষ। ঘাটাল বার অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক রামকুমার দে জানিয়েছেন, মূলত একজন বিচারকই এই হলফনামাগুলি খুঁটিয়ে দেখার দায়িত্বে রয়েছেন। স্বচ্ছতা বজায় রেখে দিনে ৫০টির বেশি হলফনামা করা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ছে। ফলে দিনের আলো ফোটার আগেই কোটা পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে এবং বেলা করে আসা কয়েকশো মানুষকে কেবল নিরাশা নিয়ে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে।

রাজনৈতিক তরজা ও কেন্দ্রকে আক্রমণ:

ভোটের মুখে এই হয়রানি নিয়ে রাজনৈতিক পারদ তুঙ্গে। তৃণমূলের ঘাটাল সাংগঠনিক জেলা সভাপতি অজিত মাইতির সাফ দাবি, “বৈধ ভোটারদের নাম উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। এটা আসলে বিজেপি নিয়ন্ত্রিত কেন্দ্রীয় সরকারের ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস’। বৈধ ভোটারদের ঘরছাড়া করে জেতার চক্রান্ত চলছে।” শাসকদলের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষের পাশে থাকার আশ্বাস দেওয়া হলেও পরিস্থিতির বিশেষ উন্নতি হয়নি।

অন্যদিকে, সাধারণ মানুষের আক্ষেপ— তাঁরা রাজনীতির মারপ্যাঁচ বোঝেন না। ট্রাইব্যুনালে আবেদনের নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং আইনি গেরোয় হলফনামা পাওয়ার এই লড়াইয়ে তাঁরা ক্রমশ দিশেহারা হয়ে পড়ছেন। ঘাটাল আদালতের গেটে মধ্যরাতের এই বিনিদ্র রজনী এখন মেদিনীপুরের রাজনীতির অন্যতম বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Share on Social Media