নিজস্ব প্রতিবেদন: ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে চোখ সরালেই কংক্রিটের জঙ্গল। ট্রাফিক সিগন্যালের লাল আলো, আর অবিরাম হর্নের শব্দে কান ঝালাপালা। সপ্তাহান্তে মনটা তাই এমন কোথাও পালাতে চায়, যেখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক দুর্বল, কিন্তু প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ প্রবল। যেখানে অ্যালার্ম ঘড়ির বদলে ঘুম ভাঙে নাম না জানা পাখির ডাকে, আর জানলা খুললেই ঘরে ঢুকে পড়ে একরাশ মেঘ।
এই উইকএন্ডে যদি চেনা দার্জিলিং বা গ্যাংটকের ভিড় এড়িয়ে একটু নির্জনতার খোঁজে থাকেন, তবে আপনার গন্তব্য হোক ডুয়ার্স ও পাহাড়ের সন্ধিক্ষণে লুকিয়ে থাকা কোনো এক নাম না জানা গ্রাম। যেখানে সবুজ চায়ের বাগান শেষ হয়ে শুরু হয় ঘন অরণ্য, আর দূরে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকে ভুটান পাহাড়।
যাত্রা যখন মুক্তির শিয়ালদহ বা হাওড়া থেকে রাতের ট্রেনে চেপে পরদিন সকালে নিউ মাল জংশন বা এনজেপি। স্টেশনে নেমে গাড়িতে সওয়ার হতেই বদলে যেতে থাকে দৃশ্যপট। শহরের ধুলো মলিন আকাশ পেছনে ফেলে গাড়ি যত তিস্তা বা করোনেশন ব্রিজের দিকে এগোবে, ততই গাঢ় হবে সবুজের রং। দুপাশে দিগন্তবিস্তৃত চা বাগান, মাঝে মাঝে শাল-সেগুনের ঘন জঙ্গল। গাড়ির কাচ নামিয়ে বুক ভরে শ্বাস নিন। এই বাতাসেই মিশে আছে মুক্তির স্বাদ।
মেঘ-কুয়াশার লুকোচুরি খেলা পাহাড়ের কোলে ছোট্ট এক হোমস্টে। কাঠের বারান্দায় বেতের চেয়ারে বসে হাতে গরম চায়ের কাপ। সামনে তাকালে দেখবেন, পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসছে পেঁজা তুলোর মতো মেঘ। কখনও ঝিরঝির বৃষ্টি, পরক্ষণেই আবার ঝলমলে রোদ। প্রকৃতির এই রূপ দেখতে দেখতে কখন যে সময় কেটে যাবে, টেরই পাবেন না। এখানে সময়ের হিসাব রাখে শুধু সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত।
কী করবেন, কী দেখবেন? এই ভ্রমণে কোনো ‘টু-ডু লিস্ট’ বা দর্শনীয় স্থানের তালিকা মেলানোর তাড়া নেই। এখানে ‘কিছু না করা’টাই আসল কাজ।
১. নদীর ধারে অলস দুপুর: পাহাড়ি গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলা স্বচ্ছ জলের নদী। নদীর ধারে পাথরের ওপর বসে পা ডুবিয়ে দিন ঠান্ডা জলে। কুলকুল শব্দে বয়ে চলা নদীর দিকে তাকিয়ে কাটিয়ে দিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
২. জঙ্গল সাফারির রোমাঞ্চ: যদি ডুয়ার্সের কাছাকাছি থাকেন, তবে ভোরবেলা বেরিয়ে পড়তে পারেন জিপ সাফারিতে। ভাগ্য ভালো থাকলে দেখা মিলতে পারে হাতি, বাইসন, বা ময়ূরের। জঙ্গলের নিস্তব্ধতার মধ্যে বন্যপ্রাণ দেখার রোমাঞ্চই আলাদা।
৩. গ্রামের পথে হাঁটা: বিকেলবেলা বেরিয়ে পড়ুন গ্রামের আঁকাবাঁকা পথে। সহজ-সরল পাহাড়ি মানুষদের জীবনযাত্রা কাছ থেকে দেখুন। তাঁদের উষ্ণ আতিথেয়তা আর একগাল হাসি আপনার মন ভালো করে দেবে।
৪. পাখিদের রাজত্ব: যদি আপনি পক্ষীপ্রেমী হন, তবে বাইনোকুলার আর ক্যামেরা নিতে ভুলবেন না। হরেক রকমের পাহাড়ি পাখির কলতানে মুখরিত থাকে এই অঞ্চল।
পেটপুজো এবং আতিথেয়তা হোমস্টের মালিকদের আন্তরিক ব্যবহার এই ভ্রমণের অন্যতম প্রাপ্তি। তাঁদের হাতের তৈরি গরম গরম ভাত, ডাল, স্থানীয় শাকসবজির তরকারি আর দেশি মুরগির ঝোলের স্বাদ মুখে লেগে থাকবে বহুদিন। আধুনিক বিলাসিতা হয়তো নেই, কিন্তু আন্তরিকতার কোনো অভাব নেই এখানে।
উপসংহার ফেরার পথে ব্যাগে হয়তো খুব বেশি শপিংয়ের জিনিস থাকবে না, কিন্তু মনে থাকবে একরাশ তাজা অক্সিজেন আর সবুজ স্মৃতি। এই যান্ত্রিক জীবনে ফের ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে এইটুকু সজীবতা তো আপনার প্রাপ্যই!
জরুরি তথ্য:
- কীভাবে যাবেন: ট্রেনে নিউ জলপাইগুড়ি বা নিউ মাল জংশন। সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে গন্তব্যে।
- কোথায় থাকবেন: ডুয়ার্স এবং কালিম্পং জেলার সংযোগস্থলে (যেমন- ঝালং, বিন্দু, সানতালেখোলা, বা সামসিং-এর কাছে) অসংখ্য সুন্দর হোমস্টে রয়েছে। আগে থেকে বুক করে নেওয়াই ভালো।
- কখন যাবেন: বর্ষা বাদে বছরের যেকোনো সময়। তবে শীত ও বসন্তে আবহাওয়া সবচেয়ে মনোরম থাকে।