ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নিজের ছেলের সঙ্গে এক বিধবার বিয়ে দিয়ে যে নজির গড়েছিলেন, আধুনিক যুগে বাগডোগরার কমলাপুর চা-বাগানে যেন তারই এক ভিন্ন আখ্যান রচিত হল। অকালবিধবা পুত্রবধূকে নিজের মেয়ে বানিয়ে, দাঁড়িয়ে থেকে তাঁর ‘কন্যাদান’ করলেন শ্বশুর ঝাড়ি ওরাওঁ। রবিবার সম্পর্কের এই অনন্য গভীরতার সাক্ষী থাকল চা-বাগানের বড়া লাইন এলাকা। ভালোবাসা আর মানবিকতার এই মেলবন্ধন আক্ষরিক অর্থেই কুসংস্কারের অন্ধকার কাটিয়ে এক নতুন ভোরের বার্তা দিয়ে গেল।
২০২০ সালের করোনাকালে ২৬ বছরের টগবগে তরুণ সুনীল ওরাওঁকে কেড়ে নিয়েছিল নিয়তি। তারপর থেকে স্বামীহারা পুত্রবধূ পুনমকে নিজেদের মেয়ের মতোই আগলে রেখেছিলেন ঝাড়ি ও তাঁর স্ত্রী রূপনী ওরাওঁ। পুনমের বাবা-মা নেই, তাই শ্বশুরমশাই তাঁর চাকরির ব্যবস্থাও করে দেন। রবিবার সেই শাশুড়ি-শ্বশুরের আশীর্বাদ নিয়েই পুনম নতুন জীবনে পা রাখলেন। পাত্র শিলিগুড়ির ৪১ নম্বর ওয়ার্ডের যুবক গৌতম ওরাওঁ। গৌতমের সঙ্গে পুনমের আলাপ ফেসবুকে হলেও, শ্বশুর ঝাড়ির সম্মতিক্রমেই তা পূর্ণতা পায়।
আদিবাসী ঐতিহ্যের সঙ্গে হিন্দু রীতির ছোঁয়ায় উৎসবের আমেজে সেজে উঠেছিল বাগিচা মহল্লা। কুড়ুক ভাষায় মন্ত্রোচ্চারণ করে বিয়ের যজ্ঞ সম্পন্ন করেন পুরোহিত ব্যানার্জি ওরাওঁ। আবেগপ্রবণ পুনম বলেন, “স্বামীকে হারানোর পর ওঁরা আমাকে কখনও বাবা-মায়ের অভাব বুঝতে দেননি। বাবা (শ্বশুর) নিজের হাতে আমার কন্যাদান করলেন, এটা আমার পরম পাওয়া।” পুনমের নতুন স্বামী গৌতম বর্তমানে বেকার, তাই ঝাড়ি ওরাওঁ জামাইকে নিজের কাছে রেখেই মেয়ের সংসার সাজিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছেন। চা-পকোড়া থেকে মাছ-মাংসের এলাহি আয়োজনে প্রায় ৩০০০ অতিথিকে আপ্যায়ন করা হয়। রক্ত নয়, মনের টানেই যে সম্পর্ক গড়ে তোলা যায়, ঝাড়ি ওরাওঁ সমাজকে সেই শিক্ষাই দিলেন।