নিজস্ব প্রতিবেদন: সকালে অ্যালার্মের কর্কশ শব্দে ঘুম ভাঙা, এক হাতে ব্রেকফাস্ট আর অন্য হাতে মোবাইল, তারপর মেট্রো বা বাসের ভিড় ঠেলে অফিস। সারাদিন ডেডলাইন, মিটিং আর বাড়ি ফিরেও ক্লান্তি। আমরা সবাই যেন এক অদৃশ্য রেস ট্র্যাকে ছুটছি। গন্তব্য জানা নেই, কিন্তু থামা বারণ।
কিন্তু কখনও কি মনে হয় না, এই দৌড় থামিয়ে একটু জিরিয়ে নেওয়া দরকার? আধুনিক লাইফস্টাইল বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভালো থাকার চাবিকাঠি এখন আর ‘মাল্টি-টাস্কিং’ বা দশহাতে কাজ করার মধ্যে নেই। বরং ভালো থাকার নতুন মন্ত্র হলো— ‘স্লো লিভিং’ (Slow Living)।
‘স্লো লিভিং’ আসলে কী? অনেকে ভাবেন ‘স্লো লিভিং’ মানে হয়তো আলস্য বা কাজ না করা। ধারণাটা সম্পূর্ণ ভুল। এর অর্থ হলো, জীবনের গতি কমিয়ে প্রতিটি মুহূর্তকে অনুভব করা। তাড়াহুড়ো করে খাবার গেলা নয়, বরং চিবিয়ে স্বাদ নেওয়া। মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ রেখে নয়, বরং প্রিয়জনের চোখে চোখ রেখে কথা বলা। সহজ কথায়, রোবটের মতো বেঁচে না থেকে, মানুষ হিসেবে প্রতিটি মুহূর্তের স্বাদ নেওয়া।
কীভাবে এই যান্ত্রিক জীবনেও খুঁজে পাবেন সেই হারিয়ে যাওয়া শান্তি? রইল কিছু সহজ টিপস।
১. ‘ফোমো’ (FOMO) নয়, অভ্যেস করুন ‘জোমো’ (JOMO) সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের শিখিয়েছে ‘ফিয়ার অফ মিসিং আউট’ বা সব কিছু থেকে বাদ পড়ার ভয়। বন্ধুরা কোথায় গেল, কে কী কিনল—এই চিন্তাই আমাদের শান্তি কেড়ে নেয়। এবার অভ্যেস করুন JOMO (Joy of Missing Out)। সব খবর রাখার দরকার নেই, সব ট্রেন্ডে গা ভাসানোর প্রয়োজন নেই। মাঝেমধ্যে অফলাইন থাকার আনন্দটা উপভোগ করুন। বিশ্বাস করুন, পৃথিবীটা আপনার জন্য থেমে থাকবে না, কিন্তু আপনি অনেক বেশি শান্ত থাকবেন।
২. ডিজিটাল ডিটক্স বা উপবাস শরীরের জন্য যেমন উপবাস জরুরি, মনের জন্য জরুরি ‘ডিজিটাল ডিটক্স’। দিনে অন্তত ৩০ মিনিট ফোনটাকে দূরে সরিয়ে রাখুন। সেটা হতে পারে রাতে খাওয়ার সময় বা সকালে ঘুম থেকে ওঠার ঠিক পরে। ওই সময়টা স্ক্রিনের নীল আলোর বদলে জানলার বাইরের আকাশ বা ঘরের গাছপালার দিকে তাকান। স্নায়ু শান্ত হবে।
৩. নিজের জন্য ‘মি-টাইম’ সারা সপ্তাহ বস, অফিস, সংসার সামলাতে গিয়ে নিজেকে সময় দেওয়া হয় না। সপ্তাহে অন্তত একটা দিন বা কয়েকটা ঘণ্টা শুধু নিজের জন্য বরাদ্দ রাখুন। সেই সময়টায় পুরনো শখ ঝালিয়ে নিন। ছবি আঁকা, বাগান করা, বা শুধুই প্রিয় বইটা নিয়ে বসে থাকা। এই সময়টুকু আপনাকে আগামী সপ্তাহের লড়াইয়ের জন্য অক্সিজেন জোগাবে।
৪. প্রকৃতির সঙ্গে বন্ধুত্ব শহরের ফ্ল্যাটে হয়তো বড় বাগান করার সুযোগ নেই। কিন্তু বারান্দায় বা জানলার তাকে ছোট ইনডোর প্ল্যান্ট তো রাখা যায়! সকালে এক কাপ চা হাতে সেই গাছগুলোর পরিচর্যা করুন। সবুজের দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখের ক্লান্তি যেমন দূর হয়, তেমনই মনের অবসাদ কাটাতেও এর জুড়ি মেলা ভার।
৫. ‘না’ বলতে শিখুন সব আবদার বা সব কাজ নিজের কাঁধে তুলে নেওয়াটা বীরত্ব নয়। নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য মাঝেমধ্যে ‘না’ বলাটাও জরুরি। অতিরিক্ত কাজের চাপে যদি দমবন্ধ লাগে, তবে বিরতি নিন। মনে রাখবেন, আপনি ভালো থাকলেই তবেই আপনার চারপাশটা সুন্দর থাকবে।
উপসংহার জীবনটা কোনো ১০০ মিটারের স্প্রিন্ট দৌড় নয়, এটা একটা ম্যারাথন। তাই তাড়াহুড়ো করে ফিনিশিং লাইনে পৌঁছনোর চেয়ে, রাস্তার ধারের ফুলগুলো দেখতে দেখতে এগোনোই বুদ্ধিমানের কাজ। আজ থেকেই একটু ‘ধীরে’ চলো নীতি নিয়ে দেখুন, জীবনটা অনেক বেশি সুন্দর মনে হবে।