নিজস্ব সংবাদদাতা, বর্ধমান: শিক্ষার মন্দিরে দুর্নীতির ছায়া। স্ক্র্যাপ বিক্রি থেকে শুরু করে নিয়োগ—একের পর এক বেনিয়মের অভিযোগ উঠল রাজ্যের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে। উপাচার্য, রেজিস্ট্রার এবং ফিন্যান্স অফিসারের বিরুদ্ধে গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ তুলে কলকাতা হাই কোর্টে দায়ের হলো রিট পিটিশন। মামলাকারীদের দাবি, পুলিশ ও শিক্ষা দফতরকে জানিয়েও লাভ হয়নি, তাই আদালতের হস্তক্ষেপেই একমাত্র ভরসা। চলতি সপ্তাহেই এই মামলার শুনানির সম্ভাবনা রয়েছে।
ঠিক কী কী অভিযোগ? আদালত সূত্রে খবর, মূলত চারটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে এই মামলা দায়ের করা হয়েছে। যেখানে স্বজনপোষণ, আর্থিক তছরুপ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো বিষয়গুলি উঠে এসেছে।
১. স্ক্র্যাপ বিক্রিতে বড়সড় গরমিল: অভিযোগের তালিকার শীর্ষে রয়েছে রাজবাটি ক্যাম্পাসের স্ক্র্যাপ বা বাতিল সামগ্রী বিক্রি নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ। নিয়ম অনুযায়ী, সরকারি সম্পত্তি বিক্রি করতে হলে ২০১৫, ২০১৬ ও ২০২১ সালের সরকারি নির্দেশিকা মেনে ই-অকশন (E-Auction) বা বৈদ্যুতিন নিলাম ডাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু অভিযোগ, উপাচার্যের জমানায় সেই নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখানো হয়েছে। গত বছরের ৬ মার্চ নোটিস জারি করে ঠিক তার পরদিন, অর্থাৎ ৭ মার্চ তড়িঘড়ি ‘স্পট অকশন’ করা হয়। অভিযোগ, সেখানে ৫২ লক্ষ টাকার সর্বোচ্চ দর এবং ৪৮ লক্ষ টাকার দ্বিতীয় দর দেওয়া সংস্থাকে বরাত না দিয়ে, মাত্র ৩৬ লক্ষ টাকা দর দেওয়া তৃতীয় একটি সংস্থাকে বরাত পাইয়ে দেওয়া হয়। কেন এই ‘ঔদার্য’, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।
২. ১০-১২ কোটি টাকার হিসেব নেই! দ্বিতীয় অভিযোগটি আরও গুরুতর। ২০২৩ সালের অডিটে ‘এজি বেঙ্গল’ (AG Bengal) বা মহানিয়ন্ত্রক বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসেবে প্রায় ১০ থেকে ১২ কোটি টাকার আর্থিক অসঙ্গতি ধরেছিল। সেই ত্রুটি সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া হলেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তা কানে তোলেনি বলে অভিযোগ।
৩. কোরাম ছাড়াই বৈঠক: বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী, এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের (EC) বৈঠক করতে গেলে নূন্যতম সদস্য সংখ্যা বা ‘কোরাম’ থাকা আবশ্যিক। অভিযোগ, ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে প্রয়োজনীয় সদস্য উপস্থিত না থাকা সত্ত্বেও জোর করে ইসি বৈঠক করা হয় এবং একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা আইনত সিদ্ধ নয়।
৪. ‘সুপার এমপ্লয়ি’ ও নিয়োগ রহস্য: সবচেয়ে চমকপ্রদ অভিযোগটি নিয়োগ সংক্রান্ত। অভিযোগ, ২০২৫ সালে প্রমোশনের ক্ষেত্রে এমন কিছু পদ তৈরি করা হয়েছে, যার কোনো অস্তিত্বই বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামোতে নেই। এখানেই শেষ নয়, এক অবসরপ্রাপ্ত কর্মীকে একই দিনে দুটি আলাদা পদে নিয়োগ করার অভিযোগ উঠেছে। ওই কর্মী একই সঙ্গে দুটি পদের বেতন এবং নিজের পেনশন—সবই পাচ্ছেন। অথচ ২০১৭ সালের রাজ্য সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, এটি সম্পূর্ণ বেআইনি।
সিবিআই তদন্তের দাবি মামলাকারীদের আইনজীবী জানান, এই সমস্ত অনিয়মের বিষয়ে পুলিশ প্রশাসন এবং শিক্ষা দফতরের প্রধান সচিবকে বারবার চিঠি দেওয়া হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অজ্ঞাত কারণে প্রশাসন নীরব। তাই বাধ্য হয়েই হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন তাঁরা। আবেদনে সিবিআই (CBI) তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে এবং পুলিশ যাতে অবিলম্বে এফআইআর দায়ের করে তদন্ত শুরু করে, সেই নির্দেশও চাওয়া হয়েছে।
শিক্ষা মহলের এখন নজর কলকাতা হাই কোর্টের দিকে। উপাচার্য-সহ শীর্ষ আধিকারিকদের বিরুদ্ধে ওঠা এই অভিযোগ প্রমাণিত হলে বড়সড় বিপাকে পড়তে পারে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।