নিউজ ডেস্ক: সাধারণ মানুষের করের টাকায় একঝাঁক নিরাপত্তারক্ষী পরিবেষ্টিত হয়ে চলাফেরা করাটা এখনকার দিনে এক ধরণের ‘স্ট্যাটাস সিম্বল’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ভোটের মরসুমে নেতাদের পুলিশি নিরাপত্তার বহর নিয়ে বারংবার প্রশ্ন তোলে নির্বাচন কমিশন। কিন্তু আদতে কোন স্তরের জনপ্রতিনিধি কতজন নিরাপত্তারক্ষী পাওয়ার অধিকারী? কীভাবে ঠিক করা হয় কার প্রাণ সংশয় ঠিক কতটা? এর নেপথ্যে রয়েছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক এবং গোয়েন্দা দপ্তরের এক অত্যন্ত জটিল ও গোপন প্রক্রিয়া।
নিরাপত্তার পাঁচ ধাপ: এক্স থেকে জেড প্লাস
ভারতে নিরাপত্তার স্তর মূলত পাঁচটি ক্যাটাগরিতে বিভক্ত। কোনো ব্যক্তির পদের চেয়েও তাঁর ওপর থাকা ‘থ্রেট’ বা ঝুঁকির ওপর ভিত্তি করেই এই সুরক্ষা বলয় তৈরি করা হয়।
-
X ক্যাটাগরি: এটি প্রাথমিক স্তর। এখানে সাধারণত ১ জন সশস্ত্র পুলিশ কর্মী (পিএসও) থাকেন।
-
Y ক্যাটাগরি: এই স্তরে ১ বা ২ জন কমান্ডো-সহ মোট ১১ জন নিরাপত্তারক্ষী থাকেন। ২ জন পিএসও রোটেশন অনুযায়ী ২৪ ঘণ্টা ডিউটি করেন।
-
Y+ ক্যাটাগরি: এখানে সশস্ত্র পুলিশের সংখ্যা বেড়ে হয় ১১-১৫ জন। সঙ্গে ২-৪ জন কমান্ডো থাকেন।
-
Z ক্যাটাগরি: অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ের নিরাপত্তা। এখানে ৪-৬ জন এনএসজি (NSG) কমান্ডো-সহ মোট ২২-২৮ জন পুলিশ কর্মী মোতায়েন থাকেন। সঙ্গে একটি এসকর্ট গাড়িও থাকে।
-
Z+ ক্যাটাগরি: এটি সর্বোচ্চ স্তর। ভিভিআইপি-দের জন্য নির্ধারিত এই স্তরে ১০-১২ জন এনএসজি কমান্ডো-সহ প্রায় ৫৫ জন সশস্ত্র নিরাপত্তারক্ষী থাকেন। বুলেটরুফ গাড়ি এবং জ্যামার-সহ বিশাল কনভয় থাকে এঁদের সাথে।
থ্রেট পারসেপশন: কীভাবে মাপা হয় বিপদের গভীরতা?
একজন নেতা বা জনপ্রতিনিধির কতটুকু নিরাপত্তা প্রয়োজন, তা কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়। এটি সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে গোয়েন্দা তথ্যের ওপর।
১. গোয়েন্দা রিপোর্ট: কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (IB) বা রাজ্যের ইন্টেলিজেন্স উইং নির্দিষ্ট সময় অন্তর রিপোর্ট দেয়। কোনো জঙ্গি সংগঠন বা অপরাধী চক্র থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে কোনো হুমকি (Written or Call) এসেছে কি না, তা যাচাই করা হয়। ২. ঝুঁকির মূল্যায়ন (Threat Assessment): সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বর্তমানে কী পদে আছেন, অতীতে তাঁর ওপর কোনও হামলা হয়েছে কি না এবং তাঁর কার্যকলাপের ফলে কোনও গোষ্ঠী ক্ষুব্ধ কি না—তা খতিয়ে দেখে একটি স্কোর তৈরি করা হয়। ৩. নিরাপত্তা কমিটি (Review Committee): স্বরাষ্ট্র সচিবের নেতৃত্বে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি এই রিপোর্টগুলি পর্যালোচনা করে নিরাপত্তার স্তর নির্ধারণ করে। প্রতি ৬ মাস বা ১ বছর অন্তর এই নিরাপত্তা পুনর্মূল্যায়ন বা ‘রিভিউ’ করা বাধ্যতামূলক।
ভোটের মুখে কমিশনের কোপ কেন?
নির্বাচনী বিধি অনুযায়ী, সরকারি খরচে পুলিশি নিরাপত্তা শুধুমাত্র তখনই পাওয়া যায় যখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রাণের প্রকৃত ঝুঁকি থাকে। অনেক সময় দেখা যায়, নিচুতলার নেতারাও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ৩-৪ জন গানম্যান নিয়ে ঘোরেন। নির্বাচনের সময় যাতে কোনো প্রার্থী বা নেতা বাড়তি প্রশাসনিক সুবিধা ভোগ করতে না পারেন এবং সাধারণ ভোটাররা যাতে ভয় না পান, তাই কমিশন ‘থ্রেট’ নেই এমন ব্যক্তিদের নিরাপত্তা তুলে নেওয়ার নির্দেশ দেয়।
সাধারণত রাষ্ট্রপতি, উপ-রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিদের জন্য ‘অটোমেটিক’ প্রোটোকল নিরাপত্তা থাকে। কিন্তু অন্যদের ক্ষেত্রে গোয়েন্দা দপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়া গানম্যান পাওয়া এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন।