নিউজ ডেস্ক: “আমার কেউ নেই, বাবা-মা নেই। আমি আর বাঁচতে চাই না।”— জলপাইগুড়ি পুরসভার ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের শান্তিপাড়ার এক জীর্ণ ঘরের ভিতর থেকে আসা এই আর্তনাদ মঙ্গলবার সকালে স্তম্ভিত করে দিল গোটা শহরকে। দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে নিজেকে অন্ধকারের খাঁচায় বন্দি করে রাখা ৪৮ বছর বয়সী রাষ্ট্রবিজ্ঞানের স্নাতক শান্তা হোমকে অবশেষে দরজা ভেঙে উদ্ধার করল পুলিশ। অনাহারে ও একাকীত্বে তাঁর শরীর এখন কঙ্কালসার, হাড় জিরজিরে শরীরে স্রেফ প্রাণের ধুকপুকুনিটুকু অবশিষ্ট।
স্থানীয় সূত্রে খবর, শান্তাদেবীর বাবা প্রমোদচন্দ্র হোম বহু বছর আগেই গত হয়েছেন। ২০১৪ সালে মা লক্ষ্মী হোমের মৃত্যুর পর থেকেই তিনি কার্যত নিঃসঙ্গ। কোনও ভাই-বোন নেই, আত্মীয়রা থাকলেও তাঁরা খবর রাখেন না। টিউশনি পড়িয়ে কোনওরকমে দিন কাটত তাঁর। কখনও নিজের হাতে রান্না করতেন, কখনও মঠের প্রসাদ খেয়ে দিন কাটাতেন। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে তিনি নিজেকে বহির্বিশ্ব থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে নেন। বাড়ির দরজা-জানলা সারাক্ষণ বন্ধ থাকায় প্রতিবেশীদের মনে সন্দেহ দানা বাঁধে।
মঙ্গলবার সকালে স্থানীয় কাউন্সিলার পৌষালি দাস ও এলাকার বাসিন্দারা দল বেঁধে শান্তাদেবীর দরজায় কড়া নাড়েন। দীর্ঘক্ষণ ডাকাডাকির পর ভিতর থেকে ক্ষীণ কণ্ঠে ভেসে আসে সেই ভয়ঙ্কর বার্তা— “আমি স্বেচ্ছামৃত্যু চাই। কেউ বিরক্ত করলে আত্মহত্যা করব।” এই হুমকিতে আতঙ্কিত হয়ে তড়িঘড়ি খবর দেওয়া হয় পুলিশে। পুলিশ এসে জানলা ভেঙে কথা বলার চেষ্টা করলেও নিজের সিদ্ধান্তে অটুট ছিলেন ওই মহিলা। অবশেষে উপায়ন্তর না দেখে দরজা ভেঙে ভিতরে ঢোকে পুলিশ ও প্রতিবেশীরা।
উদ্ধারের পর দেখা যায়, অযত্ন আর অনাহারে প্রৌঢ়ার চেনা চেহারা আমূল বদলে গিয়েছে। আধো-অন্ধকার ঘরে একাকীত্বের দহনে নিজেকে তিল তিল করে শেষ করে দিচ্ছিলেন তিনি। তড়িঘড়ি অ্যাম্বুলেন্সে করে তাঁকে জলপাইগুড়ি মেডিকেল কলেজে ভর্তি করা হয়। কাউন্সিলার পৌষালি দাস বলেন, “পুলিশ ও স্থানীয়দের সহযোগিতায় ওঁকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এখন চিকিৎসাও শুরু হয়েছে।” চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, শান্তাদেবীর শারীরিক অবস্থার পাশাপাশি তাঁর মানসিক স্বাস্থ্যের দিকটিও গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এক শিক্ষিত মহিলার এভাবে স্বেচ্ছামৃত্যু চেয়ে নিজেকে তিলে তিলে শেষ করে দেওয়ার ঘটনায় শোকের ছায়া নেমেছে শান্তিপাড়ায়।