নয়াদিল্লি: পুরাণের মহাকাব্যে সমাজভয়ে কুন্তী তাঁর ‘কানীন’ সন্তান কর্ণকে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন লোকচক্ষুর অন্তরালে। সহস্রাব্দ পেরিয়ে কলিযুগের সমাজেও অবিবাহিত বা কুমারী মায়েদের মানসিক যাতনা আর সামাজিক লাঞ্ছনার ছবিটা খুব একটা বদলায়নি। কিন্তু আধুনিক ভারতের বিচারব্যবস্থা এবার সেই যাতনার অবসান ঘটাতে এক প্রগতিশীল পদক্ষেপ করল। ভ্রূণের চেয়েও নারীর ব্যক্তি-স্বাধীনতাকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে সুপ্রিম কোর্ট জানাল, অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার অর্থই সন্তান প্রসবের বাধ্যবাধকতা নয়।
আঠারো বছরের এক তরুণী, যাঁর গর্ভস্থ ভ্রূণের বয়স ৩০ সপ্তাহ, গর্ভপাতের অনুমতি চেয়ে শীর্ষ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। বম্বে হাই কোর্ট এর আগে তাঁর আবেদন খারিজ করে দিলেও, প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ সেই রায়কে খারিজ করে দিয়ে তরুণীকে স্বস্তি দিয়েছে। আদালতের স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ— সমাজ বা সম্পর্কের দোহাই দিয়ে কোনও মহিলাকে মাতৃত্বে বাধ্য করা যায় না। নারীর শরীরের ওপর তাঁর নিজস্ব অধিকার ও ইচ্ছাই সর্বোচ্চ।
বিষয়টি নিয়ে শিক্ষামহলেও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া মিলেছে। ডায়মন্ড হারবার মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা অপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সমাজতত্ত্ববিদ বাসবী চক্রবর্তীর মতে, এটি নারীমুক্তি আন্দোলনের ইতিহাসে এক দীর্ঘ লড়াইয়ের জয়। অনেক উন্নত দেশ, এমনকি আমেরিকার মতো রাষ্ট্রেও যখন গর্ভপাতের অধিকার নিয়ে রক্ষণশীল আইন বলবৎ হচ্ছে, সেখানে ভারতের এই রায় নিঃসন্দেহে এক বৈপ্লবিক দিশারি। ২০ সপ্তাহ পর্যন্ত গর্ভপাতে আইনি বাধা না থাকলেও, পরবর্তী পর্যায়ে মেডিক্যাল বোর্ড বা আদালতের অনুমতি বাধ্যতামূলক। কিন্তু এই ক্ষেত্রে ভ্রূণের প্রাণের অধিকারের চেয়েও মায়ের মানসিক স্বাস্থ্য এবং স্বাধীন সিদ্ধান্তকেই অগ্রাধিকার দিয়েছে সর্বোচ্চ আদালত।
বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, অনিচ্ছাকৃত বা লোকলজ্জার আশঙ্কায় বড় হওয়া সন্তানদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন হতে পারে। তাই মা যদি প্রস্তুত না থাকেন, তবে সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ভ্রূণকে পৃথিবীতে না আনাটাই সমীচীন। শীর্ষ আদালতের এই সিদ্ধান্তের ফলে আগামী দিনে নারীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাধিকারের পথ আরও প্রশস্ত হলো বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।