নিউজ ডেস্ক: পুরোনো এক ২৪ ইঞ্চির সাইকেলের পিছনে বাঁধা বাঁশের কাঠামো। তাতে ঝুলছে রকমারি পাঁপড়। উশকোখুশকো চুলের ক্লান্ত প্রৌঢ় একনাগাড়ে বলে চলেছেন ‘এই পাঁপড়-পাঁপড় নেবেন, পাঁপড়’। গ্রাম-শহর কিংবা মফসসলে এমন দৃশ্য খুবই পরিচিত। তবে ইদানীং বাসিন্দাদের তীক্ষ্ণ নজর থাকছে পাঁপড় বিক্রেতার দিকে। সুযোগ পেলেই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জেনে নেওয়া হচ্ছে ওই পাঁপড় বিক্রেতার পরিচয় ও ঠিকানা। সকলের চোখেই তাঁর প্রতি সন্দেহ। যেন কোনও অপরাধ করতেই তিনি এসেছেন। কিন্তু এমন সন্দেহের কারণ কী? আসলে জেলাজুড়ে (Malda) সম্প্রতি ছেলেধরার গুজব ছড়িয়েছে ভালোমতো। সন্দেহের বশে কাউকে আটক করা কিংবা মারধরের মতো ঘটনাও ঘটছে।
সন্দেহের তালিকায় ফেরিওয়ালা ও ভবঘুরেরা: বাড়ির পেছনে আবর্জনা ফেলার স্থানে বিক্রিযোগ্য ভাঙাচোরা সামগ্রী খুঁজতে গিয়ে সন্দেহের তালিকায় পড়তে হচ্ছে কাবাড়িওয়ালাদেরও। শিশু চোর সন্দেহে গত শনিবারই এক মহিলাকে ইলেক্ট্রিক পোস্টে বেঁধে মারধর করার অভিযোগ উঠেছিল পুরাতন মালদায়। একই অভিযোগ ওঠে চাঁচল-১ ব্লকের খরবা গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকাতেও। দুটি ঘটনার ক্ষেত্রেই প্রাথমিকভাবে সন্দেহ করা ব্যক্তিরা মানসিক ভারসাম্যহীন বলে জানা গিয়েছে। জেলা পুলিশের একাংশের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছেলেধরার গুজব ছড়িয়ে পড়েছে। আর তাতেই সমস্যায় পড়তে হচ্ছে ভবঘুরে থেকে শুরু করে ফেরিওয়ালাদেরও।
আতঙ্কে জেরবার ফেরিওয়ালারা: রবিবার কাজিগ্রাম এলাকায় পাঁপড় বিক্রি করছিলেন ইউসুফ শেখ। তিনি বললেন, ‘গত কয়েকদিন ধরে যেখানেই পাঁপড় বিক্রি করতে যাচ্ছি, সেখানেই আমাকে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে। কিছু জায়গায় স্থানীয় ছেলেরা ঘিরে ধরছে। কোথা থেকে এসেছি, বাড়ি কোথায় এসব জেরা করেছে।’ পাঁপড় বিক্রেতার মতো একই অভিজ্ঞতা কাবাড়িওয়ালা সাইদুল আখতারের। তাঁর কথায়, ‘বিভিন্ন এলাকায় ভাঙাচোরা প্লাস্টিক, লোহা কুড়িয়ে বিক্রি করেই আমাদের সংসার চলে। ওই কাজের জন্য বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়াতে হয়। অনেক সময় বাড়ির পেছনে আবর্জনা ফেলার জায়গাতেও ঘুরে বেড়াই। বিভিন্ন জায়গায় লোকজনকে ছেলেধরা সন্দেহে মারধর করা হচ্ছে বলে শুনতে পাচ্ছি। এখন অপরিচিত এলাকায় প্লাস্টিক কুড়োতে গেলেই ভয় হচ্ছে।’
গুজব রুখতে পুলিশের তৎপরতা: গত কয়েক মাসে গৌড়বঙ্গজুড়ে এধরনের একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে। বিদ্যুতের খুঁটিতে সন্দেহজনকদের বেঁধে রেখে সেই দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করা হচ্ছে। নিমেষে তা ছড়িয়ে পড়ছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। তারপর সেখান থেকে জেলাজুড়ে শিশু চোর ঘুরে বেড়ানোর গুজব আরও বাড়ছে। যদিও গুজব থামাতে জেলাজুড়ে প্রচার শুরু করেছে মালদহ জেলা পুলিশ। এপ্রসঙ্গে জেলা পুলিশ সুপার অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, ছেলেধরা গুজব রুখতে জেলাজুড়ে প্রচার চালানো হচ্ছে। এছাড়া সাধারণ মানুষ সন্দেহজনক কিছু দেখলে যাতে নিজেদের হাতে আইন তুলে না নিয়ে পুলিশকে খবর দেয় সেই বিষয়েও জানান জেলা পুলিশের এক আধিকারিক। কিন্তু তারপরেও মানুষের মনের মধ্যে ছেলেধরা গুজব যেন গেঁথে গিয়েছে।