নিউজ ডেস্ক: ভোটার তালিকা সংশোধন বা এসআইআর (SIR) নিয়ে মালদহে বিচারকদের দীর্ঘক্ষণ আটকে রাখার ঘটনায় এবার বেনজির পদক্ষেপ করল সুপ্রিম কোর্ট ও নির্বাচন কমিশন। বৃহস্পতিবার এই ঘটনার তদন্তভার এনআইএ (NIA)-র হাতে তুলে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে কমিশন। একইসঙ্গে প্রশাসনের চূড়ান্ত ব্যর্থতা নিয়ে রাজ্যের মুখ্যসচিব দুষ্মন্ত নারিওয়ালা, রাজ্য পুলিশের ডিজি সিদ্ধনাথ গুপ্ত এবং মালদহের ডিএম ও এসপি-কে কড়া ভাষায় ভর্ৎসনা করে কারণ দর্শানোর নোটিস বা শো-কজ পাঠিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত।
‘আদালতকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ’, গর্জে উঠলেন প্রধান বিচারপতি:
বুধবার কালিয়াচক-২ নম্বর ব্লকের বিডিও অফিসে সাত জন বিচারককে দীর্ঘক্ষণ আটকে রাখা এবং তাঁদের গাড়িতে হামলার ঘটনাকে ‘ফৌজদারি অপরাধ’ হিসেবে গণ্য করেছে শীর্ষ আদালত। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এটা শুধু বিচারকদের ভয় দেখানো নয়, খোদ আদালতকে চ্যালেঞ্জ করা। এটা বিচারকদের মনোবল ভেঙে দেওয়ার এক পরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত চক্রান্ত।”
হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির পাঠানো চিঠির সূত্র ধরে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে:
-
প্রশাসনের অনুপস্থিতি: উত্তেজনার সময় মালদহের জেলাশাসক বা পুলিশ সুপার—কেউই ঘটনাস্থলে যাননি।
-
মুখ্যসচিবের সঙ্গে যোগাযোগহীনতা: পরিস্থিতি সামাল দিতে হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিকে নিজে থেকে ডিজি-কে ফোন করতে হয়েছে। এমনকি মুখ্যসচিবের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপেও যোগাযোগ করা যায়নি।
কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের তোপে পুলিশ কর্তারা:
বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশনের বৈঠকেও চরম অস্বস্তিতে পড়েন রাজ্যের শীর্ষ আধিকারিকরা। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার মালদহের পুলিশ সুপারকে ধমক দিয়ে বলেন, “আপনি ঘটনাস্থলে যাননি কেন?” এমনকি কলকাতার পুলিশ কমিশনার অজয় নন্দকেও ভর্ৎসনা করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, “আইপিএস অফিসার হয়েও কলকাতা সামলাতে পারছেন না? আপনাকে কি আলাদা প্রশিক্ষণ দিতে হবে?”
সুপ্রিম কোর্টের কড়া নির্দেশিকা:
বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একগুচ্ছ নির্দেশ দিয়েছে আদালত:
-
নিরাপত্তা বলয়: বিচারকদের বাসভবন ও পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে।
-
কেন্দ্রীয় বাহিনী: এসআইআর-এর কাজ চলাকালীন বিচারকদের নিরাপত্তায় মোতায়েন থাকবে কেন্দ্রীয় বাহিনী।
-
সীমিত প্রবেশ: শুনানি চলাকালীন বিচারকদের কক্ষে একসঙ্গে ৩ থেকে ৫ জনের বেশি প্রবেশ করতে পারবেন না।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া:
মালদহ ও মুর্শিদাবাদের সভা থেকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট জানিয়েছেন, এই অশান্তির দায় তাঁর সরকারের নয়। তিনি বলেন, “আইনশৃঙ্খলা এখন কমিশনের হাতে। বিচারকদের আক্রমণ করবেন না, এতে বাংলার বদনাম হয়।” অশান্তির জন্য তিনি কংগ্রেসকে দায়ী করলেও, বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী একে ‘সংগঠিত অপরাধ’ বলে দাবি করেছেন। বিজেপি ও সিপিএম উভয়েই ভোটার তালিকা সংশোধনে প্রশাসনের ব্যর্থতা নিয়ে সরব হয়েছে।
ইতিমধ্যেই এই ঘটনায় মোথাবাড়ির আইএসএফ (ISF) প্রার্থী মৌলানা শাহজাহান আলি-সহ ১৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। যদিও শাহজাহানের দাবি, তাঁকে রাজনৈতিক চক্রান্তে ফাঁসানো হয়েছে। এনআইএ তদন্ত শুরু হলে এই ঘটনার পেছনে বৃহত্তর কোনও ষড়যন্ত্র ছিল কি না, তা এবার প্রকাশ্যে আসবে।