নিউজ ডেস্ক: পাওয়ারলিফটিং— নামটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে কয়েকশো কেজি ওজন তোলার এক পেশিবহুল লড়াই। সেই গায়ের জোরের খেলায় জলপাইগুড়ির আনন্দপাড়ার ছিপছিপে মেয়ে শুভার্থী মাহাত যা করে দেখালেন, তা আদতে এক অদম্য মানসিক শক্তির জয়গাথা। ‘ওয়ার্ল্ড বেঞ্চ প্রেস’ চ্যাম্পিয়নশিপের জুনিয়র বিভাগে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে বিশ্বদরবারে দেশের নাম উজ্জ্বল করেছেন পঁচিশ বছরের এই তরুণী। তিনি রাজ্যের প্রথম প্রতিযোগী, যিনি এই বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে পদক জেতার কৃতিত্ব অর্জন করেছেন।
শুভার্থীর এই সাফল্যের পথটা লাল কার্পেটে মোড়া ছিল না। বাবা শঙ্কর মাহাত গৃহশিক্ষক, মা সরস্বতী দেবী আইসিডিএস-এর সহায়িকা। নুন আনতে পান্তা ফুরনোর সংসারে লড়াইটা ছিল নিত্যদিনের। মেয়ে যাতে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে, সেই লক্ষ্যেই মাত্র সাত বছর বয়সে শুভার্থীকে জিমন্যাস্টিকসে ভর্তি করে দিয়েছিলেন বাবা-মা। কিন্তু ২০১৩-তে প্রশিক্ষক শহর ছাড়লে থমকে যায় সেই প্র্যাকটিস। শারীরিক সমস্যা কাটাতে এরপর অ্যাথলেটিকস, ডিসকাস থ্রো হয়ে ২০১৯ সালে জিমে গিয়ে শুরু হয় পাওয়ারলিফটিং-এর সাধনা। ২০২০-তে শিলিগুড়িতে ‘স্ট্রং ওমেন’ খেতাব পাওয়ার পরই শুভার্থীর জীবনের মোড় ঘুরে যায়।
আন্তর্জাতিক স্তরে সাফল্যের মুকুট এলেও আক্ষেপের সুর কাটেনি। শুভার্থী জানালেন, “আন্তর্জাতিক খেলায় যোগ দিতে গেলে স্পনসর পাওয়া যায় না। দক্ষিণ আফ্রিকায় বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে যাওয়ার জন্য ব্যাঙ্ক থেকে চড়া সুদে লোন নিতে হয়েছিল।” ২০২৩-এ দক্ষিণ আফ্রিকার সানসিটিতে ‘ক্লাসিক বেঞ্চ প্রেস’ বিভাগে রুপো এবং ‘ইকিউড বেঞ্চ প্রেস’ বিভাগে ব্রোঞ্জ জিতে কার্যত ইতিহাস গড়েছেন তিনি।
মেয়ের এই সাফল্যে গর্বিত মা সরস্বতী দেবীও। তবে তাঁর গলায় আক্ষেপ, “এটা শক্তির খেলা, প্রচুর পুষ্টিকর খাবারের প্রয়োজন হয়। একটা সরকারি চাকরি পেলে মেয়েটা নিশ্চিন্তে দেশের জন্য আরও পদক আনতে পারত।” ফিজিক্যাল এডুকেশনে স্নাতক শুভার্থী অবশ্য দমে যাওয়ার পাত্রী নন। আপাতত অভাবের পাহাড় ডিঙিয়েই আগামী আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে সোনা জয়ের লক্ষ্যে নিজেকে তৈরি করছেন জলপাইগুড়ির এই অগ্নিকন্যা।