নিউজ ডেস্ক: ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের সেই চিরন্তন প্রার্থনা— ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে’, আজও জীবন্ত বাঁকুড়ার গঙ্গাজলঘাটি ব্লকের কাপিষ্টা গ্রামে। প্রায় ১০৪ বছর ধরে এই গ্রামে পূজিতা হয়ে আসছেন দেবী অন্নপূর্ণা। জনশ্রুতি ও ইতিহাসের মেলবন্ধনে তৈরি এই মন্দিরে বারোমাসই চলে যজ্ঞ আর ভক্তসমাগম। আসন্ন চৈত্র মাসের শুক্লাষ্টমীর বাৎসরিক পুজোকে কেন্দ্র করে এখন উৎসবের মেজাজ কাপিস্টায়।
রেলকর্মীর স্বপ্নাদেশ ও গোড়াপত্তন: মন্দিরের ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ১৯২২ সালে (১৩২৯ বঙ্গাব্দ) এই পুজোর সূচনা করেন গ্রামের বাসিন্দা গোবিন্দচন্দ্র দুবে। উত্তরপ্রদেশের মোগলসরাইয়ে রেলের কর্মী থাকাকালীন তিনি ও তাঁর স্ত্রী সুশীলাবালা নিয়মিত কাশীর অন্নপূর্ণা মন্দিরে পুজো দিতে যেতেন। পরে আসানসোলে বদলি হয়ে এলে একদিন দুর্লভপুরের জঙ্গলে এক রহস্যময়ী মহিলার দেখা পান তিনি। জনশ্রুতি অনুযায়ী, সেই মহিলাই পরে স্বপ্নে নিজেকে ‘কাশীর অন্নপূর্ণা’ পরিচয় দিয়ে গোবিন্দচন্দ্রের গৃহে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। পণ্ডিতদের পরামর্শে ১৩২৯ বঙ্গাব্দের চৈত্র শুক্লাষ্টমীতে দেবীর প্রতিষ্ঠা হয়।
কাশীধাম থেকে আসা মূর্তি: গোবিন্দচন্দ্রের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র ধনঞ্জয় এবং বর্তমানে ধনঞ্জয়ের জ্যেষ্ঠপুত্র জ্যোতিষাচার্য হৃদয়মাধব দুবে গত ৩২ বছর ধরে এই পুজো পরিচালনা করছেন। তাঁর উদ্যোগেই ২০১৭ সালে গ্রামে নির্মিত হয়েছে দেবীর সুদৃশ্য মন্দির। মন্দিরে বর্তমানে যে পাথরের বিগ্রহটি রয়েছে, তা খোদ বারাণসীর কাশীধাম থেকে আনা। হৃদয়মাধব বলেন, ‘‘দেবী অত্যন্ত জাগ্রত। তাঁর কৃপায় এখানে আসা কোনও ভক্তের অন্নের অভাব হয় না।’’
উৎসবের প্রস্তুতি: প্রতি বছর চৈত্র মাসের শুক্লাষ্টমী থেকে দশমী— তিন দিন ধরে চলে যজ্ঞ, কীর্তন ও নরনারায়ণ সেবা। দূরদূরান্ত থেকে আসা ভক্তদের জন্য গ্রামে গেস্ট হাউসও গড়ে উঠেছে। গবেষক অধ্যাপক সৌমেন রক্ষিত জানান, জেলার হাতেগোনা কয়েকটি অন্নপূর্ণা মন্দিরের মধ্যে জনপ্রিয়তার নিরিখে কাপিষ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ধর্ম, ইতিহাস ও লোকগাথার এই মিলনস্থলকে ঘিরে এখন চরম ব্যস্ততা গ্রামজুড়ে।