নিউজ ডেস্ক: বিধানসভা নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণার পর বঙ্গে প্রথম পা রেখেই সুর চড়ালেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। রবিবার কোচবিহারের রাসমেলা ময়দান থেকে তিনি একদিকে যেমন নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতার ওপর ‘আস্থাজ্ঞাপন’ করলেন, অন্যদিকে তৃণমূল সরকারের ‘দুর্নীতি’ ও ‘জঙ্গলরাজ’ নিয়ে কড়া আক্রমণ শানালেন। প্রধানমন্ত্রীর সাফ কথা, “নির্বাচন কমিশনের ওপর আমার পূর্ণ আস্থা রয়েছে। এবার বাংলায় ভয়হীন, নিরপেক্ষ ভোট হবে এবং এই ভোট হবে পরিবর্তনের জন্য।”
কমিশনের ওপর আস্থা বনাম মমতার অনাস্থা
প্রধানমন্ত্রী যখন কেন্দ্রীয় সংস্থার জয়গান গাইছেন, তখন ঠিক উল্টো মেরুতে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভোটার তালিকা সংশোধন বা এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অসঙ্গতির অভিযোগ তুলে ইতিমধ্যেই মুখ্য নির্বাচনী কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে একাধিক চিঠি দিয়েছেন তৃণমূলনেত্রী। বিভিন্ন সভা থেকে তিনি কমিশন ও বিজেপিকে ‘একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ’ বলে তোপ দাগছেন। এই আবহে মোদীর ‘আস্থা’র বার্তা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছে বিশেষজ্ঞ মহল।
‘পাপের হিসাব হবে বেছে বেছে’
কোচবিহারের মঞ্চ থেকে প্রধানমন্ত্রী তৃণমূলের ‘সিন্ডিকেট’ রাজকে তুলোধোনা করেন। ব্রিগেডের সভার রেশ টেনে তিনি বলেন, “তৃণমূলের সব পাপের হিসাব হবে, আর সেই হিসাব হবে বেছে বেছে।” মালদহের মোথাবাড়িতে বিচারকদের আটকে রাখার ঘটনার কথা উল্লেখ করে মোদী প্রশ্ন তোলেন, “যে সরকার খোদ বিচারকদের নিরাপত্তা দিতে পারে না, সেখানে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়? কালিয়াচকের ঘটনা আসলে তৃণমূলের মহাজঙ্গলরাজের জীবন্ত উদাহরণ।”
জনবিন্যাস ও অনুপ্রবেশ ইস্যু
উত্তরবঙ্গের মাটি থেকে অনুপ্রবেশ ইস্যুতেও চড়া সুর ধরেন মোদী। তাঁর অভিযোগ, তৃণমূল অনুপ্রবেশকারীদের নিজেদের ভোটব্যাঙ্ক বানিয়েছে এবং তাদের বাঁচাতেই এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করছে। তিনি বলেন, “এর ফলে বাংলার জনবিন্যাস বদলে যাচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। বিজেপি ক্ষমতায় এলে এই অনুপ্রবেশ রোখা হবে।” যদিও তৃণমূল সাংসদ কীর্তি আজ়াদ পাল্টা জবাবে বলেন, “সীমান্ত সুরক্ষিত রাখা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের কাজ। প্রধানমন্ত্রীর উচিত অবিলম্বে অযোগ্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে সরিয়ে দেওয়া।”
নারীশক্তি ও ‘ইস্তাহার’ বিতর্ক
মহিলা ভোটারদের মন জয় করতে এদিন প্রধানমন্ত্রী ‘লাখপতি দিদি’ এবং লোকসভা-বিধানসভায় ৩৩ শতাংশ নারী সংরক্ষণের কথা মনে করিয়ে দেন। তিনি দাবি করেন, বিজেপিই ‘মা-বোনেদের ফার্স্ট চয়েস’। পাশাপাশি, তৃণমূলের নির্বাচনী ইস্তাহারের নাম নিয়ে এক অদ্ভুত বিতর্কের অবতারণা করেন তিনি। মোদীর প্রশ্ন, “তৃণমূল ইস্তাহারের নাম বাংলায় রাখেনি কেন? ওরা ইশতেহার বলছে, বাংলার পরিচয় বদলে দিচ্ছে।” তবে তৃণমূলও পাল্টা মনে করিয়ে দিয়েছে যে, ২০১৪ সালে এবং এবারের প্রচারে খোদ মোদীও বহুবার ‘ইস্তাহার’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন।
এদিন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একাধিকবার বাংলায় স্লোগান দিতে দেখা যায় প্রধানমন্ত্রীকে। “জঙ্গলরাজের অন্ত হবে” বা “পাল্টানো দরকার”— মোদীর এই বাংলা বুলি রাসমেলা ময়দানে উপস্থিত সমর্থকদের মধ্যে উদ্দীপনা বাড়ালেও, তৃণমূলের দাবি, এসবই আসলে ভোটের আগে সস্তা গিমিক। কোচবিহারের এই ‘বিজয় সংকল্প সভা’ থেকে উত্তরবঙ্গের আসনগুলিতে পদ্ম-হাওয়া কতটা শক্তিশালী হয়, এখন সেটাই দেখার।