নিউজ ডেস্ক: সম্পর্কের পবিত্রতা ভেঙে পুত্রবধূকে লাগাতার যৌন নির্যাতনের অপরাধে এক ব্যক্তিকে আমৃত্যু কারাদণ্ডের নির্দেশ দিল আদালত। সোমবার বারাসতের সপ্তম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা আদালতের বিচারক প্রজ্ঞাপারমিতা হোসেন এই ঐতিহাসিক রায় শোনান। সাজাপ্রাপ্ত জয়নাল মণ্ডলের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি নির্যাতিতা পুত্রবধূকে ৬ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশও দিয়েছে আদালত। জঘন্য এই অপরাধের উপযুক্ত সাজা মেলায় স্বস্তি প্রকাশ করেছে নির্যাতিতার পরিবার।
চৌকির নীচে লুকিয়ে অপরাধীকে হাতেনাতে পাকড়াও: ঘটনাটি উত্তর ২৪ পরগনার অশোকনগরের মাগুরপাড়া গ্রামের। পেশায় ফেরিওয়ালা ছেলে প্রতিদিন সকালে কাজে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ নিয়ে পুত্রবধূকে দিনের পর দিন ধর্ষণ করত শ্বশুর জয়নাল। প্রথম দিকে কেউ বিশ্বাস না করলেও, সত্যতা প্রমাণে এক রুদ্ধশ্বাস পরিকল্পনা করেন ওই দম্পতি। ২০২৪ সালের ২৯ এপ্রিল প্রতিদিনের মতো কাজে বেরোনোর ভান করে বাড়ির পিছন দিয়ে ফিরে এসে নিজের ঘরের চৌকির নীচে লুকিয়ে পড়েন নির্যাতিতার স্বামী। কিছুক্ষণ পরেই জয়নাল পুত্রবধূকে লাঞ্ছিত করতে এলে স্বামী তাঁকে হাতেনাতে ধরে ফেলেন। ওই দিনই অশোকনগর থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের হয়।
সালিশি সভার কুরুচিকর নিদান ও সামাজিক বয়কট: পুলিশি অভিযোগের আগে বিষয়টি গ্রামবাসীদের জানানো হলে এক অমানবিক পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয় দম্পতিকে। গ্রামে সালিশি সভা বসিয়ে উল্টে অভিযুক্ত শ্বশুরকেই ‘স্বামী’ হিসেবে মেনে নেওয়ার ফতোয়া দেওয়া হয় পুত্রবধূকে। দম্পতি এই কুরুচিকর প্রস্তাব মানতে অস্বীকার করলে তাঁদের ওপর নেমে আসে ‘সামাজিক বয়কট’-এর খাঁড়া। পাড়ার টিউবওয়েল থেকে জল নেওয়া বা দোকান থেকে নুন-তেল কেনা পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়ে তাঁদের কার্যত একঘরে করে রাখা হয়।
আইনি লড়াই ও আদালতের রায়: গ্রেপ্তার হওয়ার পর জামিন পেয়ে ফিরে এসে জয়নাল ওই দম্পতিকে লাগাতার প্রাণনাশের হুমকি দিতে থাকে। এরপর আদালতের নির্দেশে পুনরায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। সরকারি আইনজীবী তীর্থঙ্কর পাল জানান, ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৬(২)(এফ) ধারায় মামলাটি চলছিল। সোমবার দোষী সাব্যস্ত করে বিচারক জয়নালকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ১ লক্ষ টাকা জরিমানা করেন। একইসঙ্গে রাজ্য আইনি পরিষেবা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে নির্যাতিতা ওই মহিলাকে ৬ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে।
পরিবারের প্রতিক্রিয়া: রায় ঘোষণার পর আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন নির্যাতিতা। তিনি বলেন, “মামলা করার পর থেকে দুই সন্তান নিয়ে আমরা চূড়ান্ত অসহায় অবস্থায় ছিলাম। সম্মান বাঁচাতে পুলিশ আমাদের গোপন জায়গায় রেখেছিল। আজকের রায়ে আমরা শান্তিতে বাঁচতে পারব।” কলঙ্কিত এই অধ্যায়ের অবসানে বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ফিরে পেয়েছে অশোকনগরের ওই পরিবারটি।