নিজস্ব প্রতিবেদন: অসুখ সারাতে ওষুধের ওপর ভরসা করেন সাধারণ মানুষ। কিন্তু সেই ওষুধই যদি হয় ‘বিষ’ বা অকেজো, তবে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়? ফের বড়সড় প্রশ্নের মুখে রাজ্যের ওষুধ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের গুণমান পরীক্ষায় ডাহা ফেল করল বিভিন্ন নামী-দামি সংস্থার তৈরি ৪৫টি ওষুধের নির্দিষ্ট কিছু ব্যাচ। আর উদ্বেগের বিষয় হলো, সেই তালিকায় জ্বলজ্বল করছে খোদ পশ্চিমবঙ্গেরই ৫টি সংস্থার নাম। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর যে, তড়িঘড়ি নির্দেশিকা জারি করে ওই নির্দিষ্ট ব্যাচের ওষুধগুলি বাজার ও হাসপাতাল থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য ভবন।
ফের কাঠগড়ায় ‘পশ্চিমবঙ্গ ফার্মাসিউটিক্যালস’ গত বছর রিঙ্গার্স ল্যাকটেট স্যালাইন নিয়ে তোলপাড় হয়েছিল রাজ্য। গুণমানের প্রশ্নে কাঠগড়ায় তোলা হয়েছিল উত্তর দিনাজপুরের চোপড়ার সংস্থা ‘পশ্চিমবঙ্গ ফার্মাসিউটিক্যালস’-কে। সরকারি হাসপাতালগুলিতে ওই সংস্থার স্যালাইন ব্যবহার নিষিদ্ধও করা হয়েছিল। কিন্তু ছবিটা যে খুব একটা বদলায়নি, তা ফের প্রমাণ হলো।
স্বাস্থ্য দফতর সূত্রে খবর, গত ডিসেম্বর মাসে ওই সংস্থার তৈরি রিঙ্গার্স ল্যাকটেট স্যালাইনের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছিল অসমের গুয়াহাটির ল্যাবরেটরিতে। রিপোর্ট আসতেই দেখা যায়, ওই স্যালাইনের ‘০৩বি৩৯১১’ (03B3911) ব্যাচটি গুণমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি। পুরনো বিতর্ক মিটতে না মিটতেই ফের একই সংস্থার নাম জড়ালো নিম্নমানের ওষুধের তালিকায়।
বাদ গেল না ইঞ্জেকশন থেকে ওআরএস শুধু উত্তর দিনাজপুর নয়, গুণমানহীন ওষুধের তালিকায় নাম জড়িয়েছে কলকাতা ও হাওড়ার একাধিক ওষুধ প্রস্তুতকারক সংস্থারও। কী কী রয়েছে সেই তালিকায়?
- হাওড়ার উলুবেড়িয়া: এখানকার ‘লাইফ ফার্মাসিউটিক্যালস প্রাইভেট লিমিটেড’-এর তৈরি ‘ক্রোমোস্ট্যাট’ (Chromostat) ইঞ্জেকশনের একটি ব্যাচ পরীক্ষায় পাশ করতে পারেনি। রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে সাধারণত এই ইঞ্জেকশন ব্যবহার করা হয়, তাই এর গুণমান নিয়ে আপস বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে।
- হাওড়ার জগাছা: এখানকার ‘ডায়মন্ড ড্রাগস’-এর তৈরি ‘ড্রায়েড অ্যালুমিনিয়াম হাইড্রক্সাইড জেল’-এর একটি ব্যাচও গুণমান পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে।
- কলকাতা: শহরের বুকে তৈরি ওষুধও প্রশ্নের বাইরে নয়। কলকাতার ‘সানি ইন্ডাস্ট্রিজ’-এর তৈরি পটাশিয়াম ক্লোরাইড এবং ‘ক্যাপলেট ইন্ডিয়া প্রাইভেট লিমিটেড’-এর তৈরি ওরাল রিহাইড্রেশন সল্টস বা ওআরএস (ORS)-এর নির্দিষ্ট ব্যাচ পরীক্ষায় ডাহা ফেল করেছে।
উল্লেখ্য, রাজ্যের এই চারটি সংস্থার ওষুধের নমুনা খাস কলকাতার ল্যাবরেটরিতেই পরীক্ষা করা হয়েছিল এবং সেখানেই গলদ ধরা পড়ে।
ডিসেম্বরেই শুরু হয়েছিল নজরদারি স্বাস্থ্য ভবন সূত্রে জানা গিয়েছে, ওষুধের গুণমান যাচাইয়ের জন্য গত ডিসেম্বর মাসজুড়ে বিশেষ অভিযান চালানো হয়েছিল। বাজার থেকে এবং সরকারি স্টোর থেকে বিভিন্ন ওষুধের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। সেই নমুনাগুলি রাজ্যের বিভিন্ন ল্যাবরেটরি এবং ভিন্রাজ্যের পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছিল। সম্প্রতি সেই পরীক্ষার রিপোর্ট হাতে আসতেই নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন।
ভিন্রাজ্যের ওষুধও তালিকায় শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গের সংস্থাই নয়, কেন্দ্রীয় ওই তালিকায় নাম রয়েছে গুজরাত, হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, পঞ্জাব এবং হরিয়ানার মতো রাজ্যের একাধিক ওষুধ সংস্থার। অ্যান্টিবায়োটিক ট্যাবলেট থেকে শুরু করে বাচ্চাদের কাশির সিরাপ—বাদ যায়নি কিছুই।
কড়া নির্দেশ স্বাস্থ্য দফতরের জনস্বাস্থ্যের কথা মাথায় রেখে কালবিলম্ব করেনি স্বাস্থ্য দফতর। বিজ্ঞপ্তিতে সাফ জানানো হয়েছে, তালিকায় উল্লিখিত ৪৫টি ওষুধের নির্দিষ্ট ব্যাচ অবিলম্বে নিষিদ্ধ করা হলো। ১. যে সমস্ত ওষুধ ইতিমধ্যেই বাজারে বা ওষুধের দোকানে পৌঁছে গিয়েছে, তা দ্রুত সরিয়ে ফেলতে হবে। ২. সরকারি বা বেসরকারি—কোনো হাসপাতালেই যেন ওই নির্দিষ্ট ব্যাচের ওষুধ রোগীদের প্রয়োগ না করা হয়।
স্বাস্থ্য কর্তাদের একাংশের মতে, জীবনদায়ী ওষুধের ক্ষেত্রে এই ধরনের গাফিলতি বরদাস্ত করা হবে না। প্রয়োজনে অভিযুক্ত সংস্থাগুলির বিরুদ্ধে আরও কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।