নিউজ ডেস্ক: কেন্দ্রীয় সরকার ও বিভিন্ন রাজ্যের স্কলারশিপ পোর্টাল হ্যাক করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া সাইবার অপরাধের মূল পাণ্ডা ইমরান আলি ওরফে সরজুকে অবশেষে গ্রেপ্তার করল পুলিশ। উত্তর দিনাজপুরের চোপড়ার বাসিন্দা এই সাইবার ‘ডাকু’র কীর্তিতে ঘুম উড়েছিল ভিনরাজ্যের পুলিশেরও। রাজস্থান পুলিশ তার সন্ধান পেতে ২১ হাজার টাকার পুরস্কারও ঘোষণা করেছিল। দীর্ঘ লুকোচুরির পর অবশেষে পুলিশের জালে ধরা পড়ল এই মোস্ট ওয়ান্টেড অপরাধী।
তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, ইমরানের মূল টার্গেট ছিল পড়ুয়াদের জন্য বরাদ্দ বিভিন্ন সরকারি স্কলারশিপ ও অনুদানের টাকা। বিশেষ করে ‘ন্যাশনাল স্কলারশিপ পোর্টাল’ থেকে সে প্রায় এক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে মনে করছে পুলিশ। ২০২১ সাল থেকে অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে কাজ করছিল ইমরানের এই গ্যাং। কেরলের পড়ুয়াদের স্কলারশিপের টাকা হাতানোর পাশাপাশি, এ রাজ্যের পড়ুয়াদের জন্য বরাদ্দ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাধের ‘তরুণের স্বপ্ন’ প্রকল্পের ট্যাবের টাকাও লোপাট করেছিল এই চোপড়া গ্যাং। সেই সময় পূর্ব বর্ধমান ও পূর্ব মেদিনীপুর জেলার পুলিশ চোপড়ায় অভিযান চালিয়ে বেশ কিছু সাইবার অপরাধীকে গ্রেপ্তার করলেও, ইমরানকে ছোঁয়া যায়নি।
কীভাবে চলত এই কোটি কোটি টাকার জালিয়াতি?
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ইমরানের এই চক্রের জাল দেশের বিভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে রয়েছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, স্কলারশিপের টাকা পাওয়ার জন্য ছাত্রছাত্রীদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নম্বর, পরিচয়পত্র সহ বিভিন্ন জরুরি নথি জমা দিতে হয়। এই তথ্য আপলোডের দায়িত্বে থাকা সরকার নিয়ন্ত্রিত কিছু সংস্থার কর্মীদের একাংশকে মোটা টাকার লোভ দেখিয়ে নিজেদের দলে টেনেছিল ইমরান। সেই ‘সর্ষের মধ্যেই থাকা ভূত’রা পড়ুয়াদের সমস্ত গোপন তথ্য সাইবার অপরাধীদের পাচার করে দিত। এই মুহূর্তে তথ্য পাচারকারী সেই সরকারি কর্মীরাও পুলিশের কড়া স্ক্যানারে রয়েছেন।
তথ্য হাতে পাওয়ার পর বিশেষ সফটওয়্যার টেকনোলজির মাধ্যমে পড়ুয়াদের টাকা অন্য অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করে দিত এই গ্যাং। এই কাজের জন্য তারা বিভিন্ন সাধারণ মানুষের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ভাড়ায় নিত এবং টাকা তোলার পর অ্যাকাউন্ট হোল্ডারদের সামান্য কিছু কমিশন দেওয়া হতো। টাকা অ্যাকাউন্টে ঢোকার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তা তুলে নিত ইমরানের দল।
সম্প্রতি রাজস্থানের প্রায় ১২০ জন ছাত্রছাত্রীর স্কলারশিপের টাকা এই পদ্ধতিতে লোপাট হওয়ার পর নড়েচড়ে বসে রাজস্থান পুলিশ। তদন্তে নেমে প্রথমে এই গ্যাংয়ের চার জনকে গ্রেপ্তার করেন আধিকারিকরা। তাঁদের জেরা করেই উঠে আসে মাস্টারমাইন্ড ইমরানের নাম। রাজস্থান পুলিশের একটি বিশেষ দল টানা ১০ দিন উত্তরপ্রদেশে ডেরা জমিয়ে অপেক্ষা করার পর সুকৌশলে ইমরানকে জালে তোলে।
ধৃতের কাছ থেকে ল্যাপটপ, একাধিক ভুয়ো সিমকার্ড সহ বিভিন্ন ধরনের আধুনিক ইলেকট্রনিক সামগ্রী উদ্ধার হয়েছে। ধৃতকে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে ম্যারাথন জেরা করছে রাজস্থান পুলিশ। জানা গিয়েছে, চোপড়া ছাড়াও বিহারের কিষাণগঞ্জের বেশ কয়েকজন এই গ্যাংয়ের সক্রিয় সদস্য। তারা আলাদা আলাদা দলে ভাগ হয়ে কাজ করত। একটি দল তথ্য জোগাড় করত, অন্য দল অ্যাকাউন্ট ভাড়া নিত এবং ইমরান নিজে টাকা সরানোর মূল অপারেশন পরিচালনা করত। ইদানীং চোপড়ার ওপর পুলিশের কড়া নজরদারি থাকায় ইমরান বিহারে বসে তার এই সাম্রাজ্য চালাচ্ছিল বলে জানতে পেরেছেন তদন্তকারীরা।