নিজস্ব সংবাদদাতা, লাভপুর: রেলের ভাঁড়ারে বছরে পঞ্চাশ কোটি টাকার বেশি জোগান দিয়েও কি ব্রাত্যই থাকবে রামপুরহাট জংশন? তারাপীঠ থেকে নবদ্বীপ—দুই তীর্থক্ষেত্রের সংযোগকারী আহমদপুর-কাটোয়া রুট কি এভাবেই অবহেলার শিকার হবে? বৃহস্পতিবার হাওড়ায় ডিআরএম দপ্তরে এমনই সব অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখে পড়তে হলো রেলকর্তাদের। রেলের আয়ের পরিসংখ্যান তুলে ধরে বঞ্চনার বিরুদ্ধে সোজাসাপ্টা সরব হলো ‘আহমদপুর কাটোয়া রেলওয়ে প্যাসেঞ্জার অ্যাসোসিয়েশন’। সংগঠনের সাফ কথা, রেলের বাণিজ্যিক স্বার্থেই এই গুরুত্বপূর্ণ রুটকে আর ফেলে রাখা উচিত নয়।
১৫ জানুয়ারি, বৃহস্পতিবার সংগঠনের তিন সদস্যের এক প্রতিনিধিদল—সুবীর সেন, সৌভিক মন্ডল এবং কাজী সইফুল ইসলাম—হাওড়ার ডিভিশনাল রেলওয়ে ম্যানেজারের (ডিআরএম) সঙ্গে দেখা করেন। চিরাচরিত স্মারকলিপি জমা দেওয়ার বদলে এদিন তাঁরা রেলের পরিকাঠামোগত ত্রুটি এবং সম্পদের অপচয়ের দিকগুলো তথ্যসহকারে আধিকারিকদের সামনে তুলে ধরেন। সংগঠনের তরফে মূলত ফোকাস করা হয় আহমদপুর-কাটোয়া রেলপথ এবং সংলগ্ন রামপুরহাট জংশনের ওপর। তাদের যুক্তি, গত অর্থবর্ষে রামপুরহাট স্টেশন আয়ের নিরিখে পূর্ব রেলের প্রথম দশটি স্টেশনের মধ্যে জায়গা করে নিলেও, গত এক দশকে এখান থেকে একটিও নতুন মেমু বা প্যাসেঞ্জার ট্রেন চালু হয়নি।
সংগঠনের সম্পাদক সুবীর সেন জানান, গত ৭ ডিসেম্বর ‘গীতা পাঠ স্পেশাল’ সফলভাবে চালিয়ে রেল নিজেই প্রমাণ করেছে যে, রামপুরহাট থেকে আহমদপুর-লাভপুর-কাটোয়া হয়ে হাওড়া পর্যন্ত ট্রেন চালানো প্রযুক্তিগতভাবে সম্পূর্ণ সম্ভব। সেই সূত্র ধরেই সংগঠনের দাবি, অবিলম্বে এই পথে ‘মা ফুল্লরা ফাস্ট প্যাসেঞ্জার অথবা এক্সপ্রেস’ চালু করা হোক। এতে শুধু নিত্যযাত্রীরা নন, তারাপীঠ ও নবদ্বীপের তীর্থযাত্রীরাও উপকৃত হবেন এবং রেলের রাজস্ব বাড়বে। পাশাপাশি, হাওড়া থেকে রাতে কাটোয়ায় এসে যে লোকাল ট্রেনগুলি সারারাত দাঁড়িয়ে থাকে, সেগুলিকে অলস বসিয়ে না রেখে রাতেই রামপুরহাট বা আহমদপুর পর্যন্ত সম্প্রসারণের প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠন। তাঁদের যুক্তি, এতে রেলের বাড়তি রেক বা কামরার প্রয়োজন হবে না, অথচ যাত্রীরা গভীর রাতেও গন্তব্যে পৌঁছতে পারবেন।
বৈঠকে আহমদপুর জংশনের গুরুত্ব নিয়েও সরব হন সংগঠনের প্রতিনিধিরা। ১লা জানুয়ারি থেকে নতুন সময়সূচি চালু হওয়ার পর আহমদপুরে নামার পর সংযোগকারী ট্রেনের যে আকাল দেখা দিয়েছে, তা মেটাতে কুলিক এক্সপ্রেস ও সাহেবগঞ্জ ইন্টারসিটির মতো ট্রেনগুলিকে সেখানে থামানোর দাবি জানানো হয়েছে। এছাড়া কাটোয়া-আহমদপুর লোকাল ট্রেনগুলিকে রামপুরহাট পর্যন্ত সম্প্রসারণ এবং যাত্রী সুরক্ষায় সব স্টেশনে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা কর্মী নিয়োগের বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে।
সাক্ষাৎ শেষে সংগঠনের অন্যতম সদস্য সৌভিক মন্ডল বলেন, ‘‘ডিআরএম মহাশয় আমাদের যুক্তিগুলি মন দিয়ে শুনেছেন। আমরা বুঝিয়েছি, এই দাবিগুলো মানলে আখেরে রেলেরই আয় বাড়বে।’’ রেল সূত্রে খবর, যাত্রী সংগঠনের এই প্রস্তাবগুলি গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে শুধুই আশ্বাস নয়, দাবি দ্রুত কার্যকর না হলে আগামী দিনে বৃহত্তর আন্দোলনের পথে হাঁটার হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে আহমদপুর কাটোয়া রেলওয়ে প্যাসেঞ্জার অ্যাসোসিয়েশন।
দীর্ঘদিনের জট কাটিয়ে এবার হয়তো আশার আলো দেখছেন নিত্যযাত্রীরা। রেলকর্তাদের ইতিবাচক মনোভাব ও ধৈর্য সহকারে অভাব-অভিযোগ শোনার পর সংগঠনের সদস্যরাও আশাবাদী যে, খুব শীঘ্রই হয়তো ঘরের কাছের স্টেশন থেকে কলকাতা যাওয়ার বহুদিনের লালিত স্বপ্ন বাস্তবে ধরা দেবে। নতুন ট্রেনের চাকা কবে গড়ায়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে আপামর বীরভূমবাসী।