নিউজ ডেস্ক: দেশভাগের ক্ষত মানেই সাধারণত আমাদের চোখে ভেসে ওঠে পূর্ববঙ্গ থেকে এপার বাংলায় চলে আসা কোটি কোটি মানুষের জীবনসংগ্রাম। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠ অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গ থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে পাড়ি দেওয়া কয়েক লক্ষ মুসলমান মানুষের লড়াই ও স্বপ্নভঙ্গের কাহিনী এতদিন প্রচারের আড়ালেই ছিল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক নিসারুদ্দিন আহমেদের একটি গবেষণাপত্রে এবার উঠে এল সেই অজানা ইতিহাস, যা সম্প্রতি আন্তর্জাতিক জার্নাল ‘এশিয়ান স্টাডিজ রিভিউ’-তে স্থান পেয়েছে।
গবেষণায় দেশভাগের পর ওপারে পাড়ি দেওয়া মানুষদের কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রথমত, ‘অপটিজ’ বা সরকারি কর্মচারী, যাঁরা বিকল্প সুযোগ পেয়ে পূর্ব পাকিস্তানে যোগ দিয়েছিলেন। রাইটার্স বিল্ডিংসের কর্মী মহম্মদ মোসলেম আলির মতো বহু আধিকারিক সেখানে গিয়ে আবাসন, পানীয় জল ও বিদ্যুৎ সংকটে নাজেহাল হন। দ্বিতীয়ত, ‘প্যাট্রিয়ন ও জব সিকার্স’, যাঁরা মুসলিমদের জন্য তৈরি নতুন দেশে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশায় গিয়েছিলেন, কিন্তু সেখানে গিয়ে তীব্র বাসস্থানের অভাব ও সামাজিক বৈষম্যের মুখে পড়েন। এছাড়া ১৯৪৬-এর দাঙ্গা-পরবর্তী পরিস্থিতিতে ভিটেমাটি হারানো বহু মানুষ এবং পূর্ববঙ্গের আদি বাসিন্দা হয়েও পশ্চিমবঙ্গে থিতু হওয়া ‘হোম কামার্স’রা বাধ্য হয়ে ওপারে ফিরে যান।
গবেষণায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল সম্পত্তি বিনিময় বা ‘এক্সচেঞ্জিস’। মূলত মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তরা ওপার থেকে আসা হিন্দুদের সঙ্গে ভিটেমাটি অদলবদল করেছিলেন। ১৯৫১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, চট্টগ্রাম, ঢাকা ও রাজশাহী ডিভিশনে প্রায় ৭ লক্ষ উদ্বাস্তু ছিলেন, যার মধ্যে ১ লক্ষেরও বেশি ছিলেন উর্দুভাষী। কিন্তু সেখানে গিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি। পরিকাঠামোগত অভাব, ভাষাগত বৈষম্য এবং সরকারি আধিকারিকদের দুর্নীতির শিকার হতে হয় তাঁদের। জমির পাট্টা পেতে গুণতে হয়েছে মোটা অঙ্কের ঘুষ। শেষ পর্যন্ত স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণায় অনেকেই আবার এপার বাংলায় ফিরে আসতে বাধ্য হন। দেশভাগের এই দ্বিমুখী যন্ত্রণার দলিল নিসারুদ্দিনের এই গবেষণায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।