নিউজ ডেস্ক: বাড়ির সামনেই রাখা রয়েছে বাইক। মালিকও রয়েছেন নিজের ঘরে। কিন্তু ভরসন্ধ্যায় আচমকাই মোবাইলে ভেসে এল কলকাতা পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের একটি মেসেজ! তাতে লেখা— ‘যাদবপুর সন্তোষপুরের কাছে জোড়া ব্রিজে বিপজ্জনক গতিতে বাইক চালানোর অপরাধে জরিমানা করা হলো আপনার গাড়িকে।’ মেসেজ দেখেই চক্ষু চড়কগাছ হাওড়ার সালকিয়ার বাসিন্দা সোনুকুমার ভার্মার। নিজের গাড়ি হাওড়ায় অক্ষত অবস্থায় থাকার পরেও কীভাবে কলকাতায় জরিমানা হতে পারে, তা ভেবেই তাজ্জব হয়ে যান তিনি। এই ঘটনার তদন্তে নেমে এক বড়সড় আন্তর্জাতিক বা আন্তঃরাজ্য গাড়ি নম্বর জালিয়াতি চক্রের হদিস পেল কলকাতা পুলিশ।
অভিযোগকারী সোনুকুমারের দাবি, তাঁর এই বাইকটি কলকাতায় সাধারণত যায় না বললেই চলে। সেখানে দক্ষিণ-পূর্ব কলকাতার একেবারে শেষ প্রান্তে কীভাবে তাঁর গাড়ির গতিবিধি ধরা পড়ল, তা নিয়ে সন্দিহান হয়ে তিনি সরাসরি কলকাতা পুলিশের দ্বারস্থ হন। ট্রাফিক বিভাগ বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করলে জানা যায়, সার্ভে পার্ক থানা এলাকার জোড়া ব্রিজের ট্রাফিক ক্যামেরায় সোনুর বাইকের রেজিস্ট্রেশন নম্বরটি ধরা পড়েছিল এবং সেই অনুযায়ীই ডিজিটাল জরিমানা করা হয়।
এর পর ট্রাফিক পুলিশের তরফে সেই কেসের ডিজিটাল নথি ও সিসিটিভি ক্যামেরায় ওঠা ছবি অভিযোগকারী যুবককে দেখানো হয়। প্রমাণস্বরূপ পুলিশের হাতের থাকা ছবি দেখে আকাশ থেকে পড়েন সোনু। ছবিতে দেখা যায়, বাইকের নম্বর প্লেটের নম্বরটি হুবহু তাঁর গাড়ির নম্বরের সঙ্গে মিলে গেলেও, আসল বাইকটি তাঁর নয়! এমনকি যে ব্যক্তি হেলমেট মাথায় দিয়ে ওই বাইকটি চালাচ্ছিলেন, তিনিও সোনু নন। চালকের মাথায় হেলমেট থাকায় প্রাথমিকভাবে ট্রাফিক আধিকারিকরা সোনুর কথা বিশ্বাস করতে চাননি।
রহস্যের জট খুলতে এর পর ট্রাফিক ক্যামেরায় ওঠা ছবির নির্দিষ্ট সময় এবং সোনুর মোবাইলের কল ডিটেইলস রেকর্ড (CDR) খতিয়ে দেখেন তদন্তকারীরা। তাতেই দুধের শিশু আর জলের তফাত স্পষ্ট হয়ে যায়। দেখা যায়, যে সময়ে সার্ভে পার্ক থানা এলাকায় ওই বিধিভঙ্গকারী বাইকটিকে ট্রাফিক ক্যামেরা চিহ্নিত করেছিল, ঠিক সেই সময়ে সোনুর মোবাইলের টাওয়ার লোকেশন ছিল হাওড়ার সালকিয়াতেই। অর্থাৎ, অপরাধের সময়ে বাইকের আসল মালিক ও তাঁর গাড়ি দুই-ই হাওড়াতে উপস্থিত ছিল।
এই প্রমাণের পর উর্দিধারীদের কাছে বিষয়টি জলের মতো পরিষ্কার হয়ে যায়। তদন্তকারীরা নিশ্চিত হন যে, সোনুর বাইকের আসল নম্বরপ্লেটটি সুকৌশলে জাল করেছে কোনও অপরাধী চক্র। সেই ক্লোন করা বা জাল নম্বরপ্লেটটি অন্য একটি বাইকে ব্যবহার করে রমরমিয়ে শহর জুড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে অজ্ঞাতপরিচয় চালক। ট্রাফিক বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্তাদের নির্দেশে ইতিমধ্যেই সার্ভে পার্ক থানায় এই নিয়ে একটি লিখিত প্রতারণার অভিযোগ দায়ের করেছেন সোনু। সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখে জাল নম্বর প্লেট লাগানো ওই বাইকটিকে চিহ্নিত করা সম্ভব হলেও, চালকের পরিচয় এখনও অধরা। কোথা থেকে এবং কীভাবে হাওড়ার এই যুবকের গাড়ির নম্বরপ্লেটটি হুবহু নকল করা হলো, তার উৎসের খোঁজে তল্লাশি শুরু করেছে পুলিশ।