নিউজ ডেস্ক: বর্ষার সময়ে শহরের জলযন্ত্রণা মেটাতে এবং নিকাশি ব্যবস্থাকে আরও দ্রুত ও আধুনিক করে তুলতে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ করতে চলেছে কলকাতা পুরসভা (KMC)। এবার থেকে শহরে বৃষ্টি নামলে আর নির্দেশ বা ফোনের অপেক্ষায় বসে থাকতে হবে না, জল জমার সংকেত পেলেই নিজে থেকে চালু হয়ে যাবে ড্রেনেজ পাম্পিং স্টেশনগুলি! এমনকি গঙ্গা ও আদিগঙ্গার জোয়ার-ভাটার হিসাব কষে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলবে ও বন্ধ হবে শহরের লকগেটগুলি। গোটা পরিকাঠামোটি পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হবে একটি বিশেষ কেন্দ্রীয় সার্ভার থেকে। পরিকল্পনাটি বেশ কিছুদিনের পুরনো হলেও, অবশেষে তা বাস্তবায়িত করতে চলেছে পুর কর্তৃপক্ষ। সম্প্রতি এই বিষয়ে পুরসভায় আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে এবং এই মেগা স্বয়ংক্রিয় প্রজেক্টটি রূপায়ণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে রাজ্য সরকারের নামী সংস্থা ‘ওয়েবেল’ (Webel)-কে।
বর্তমানে কলকাতা পুরসভার অধীনস্থ পাম্পিং স্টেশনগুলিতে ম্যানুয়ালি অর্থাৎ কর্মচারীদের হাতেই সমস্ত পাম্প ও লকগেট চালানো হয়। বিশেষ করে বর্ষাকালে ২৪ ঘণ্টা শিফট ভাগ করে কর্মী ও আধিকারিকদের পাম্পিং স্টেশন ও গঙ্গার ধারের বিপজ্জনক লকগেটগুলিতে মোতায়েন রাখতে হয়। টেলিফোনে পাওয়া বার্তার ওপর ভিত্তি করেই পাম্প চালানো বা বন্ধ করার কাজ চলত। এই দীর্ঘসূত্রতা কাটাতেই পুরসভা এলাকার ৮০টি ড্রেনেজ পাম্পিং স্টেশনের মোট ৪৬০টি স্থায়ী পাম্পে বসানো হচ্ছে অত্যাধুনিক ‘সেন্সর’। পাশাপাশি, সমস্ত প্রধান লকগেটেও যুক্ত হবে সেন্সর প্রযুক্তি।
এই সেন্সরগুলির সাথে সরাসরি সংযোগ থাকবে পুরসভার সেন্ট্রাল কন্ট্রোল রুমের সার্ভারের। শুধু তাই নয়, শহরের বিভিন্ন নিচু ও জলপ্রবণ রাস্তাতেও বসানো হবে বিশেষ ওয়াটার সেন্সর। বৃষ্টি হয়ে রাস্তায় জল জমতে শুরু করলেই সেই রিয়েল-টাইম সংকেত চলে যাবে কন্ট্রোল রুমে এবং মুহূর্তের মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাম্পগুলি জল বের করতে শুরু করে দেবে। জোয়ারের সময়ে লকগেট বন্ধ করা এবং ভাটা নামলেই তা খুলে দেওয়ার কাজও করবে এই সেন্সর নির্ভর ব্যবস্থা।
স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি চালু হলে কি তবে কাজ হারাবেন পাম্পিং স্টেশনের কর্মীরা? এই জল্পনা উড়িয়ে দিয়ে পুরসভার নিকাশি বিভাগের আধিকারিকরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, কর্মচারীদের কাজ বন্ধ হওয়ার কোনো কারণ নেই। পাম্প চালানোর পাশাপাশি পাম্পিং স্টেশনে অন্যান্য একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রক্ষণাবেক্ষণের কাজ থাকে। এছাড়া কোনো কারণে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে জরুরি ভিত্তিতে ম্যানুয়ালি পাম্প চালুর জন্য কর্মীদের উপস্থিতি আবশ্যক। তবে ঝড়জল ও দুর্যোগের রাতে গঙ্গার ধারে জীবন বাজি রেখে যে কর্মীদের লকগেটে পাহারা দিতে হতো, এই ‘স্মার্ট’ ব্যবস্থার ফলে তাঁদের কাজের ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসবে।
উল্লেখ্য, বহু বছর আগে ‘কেইআইআইপি’ (KEIIP) প্রকল্পের আওতায় সেন্সর বসিয়ে নিকাশি ব্যবস্থা আধুনিক করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেই প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়েছিল। এবার সেই অতীত ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ওয়েবেলের প্রযুক্তিগত সহায়তায় কলকাতা শহরকে চিরতরে জলযন্ত্রণামুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে পুরোদমে ময়দানে নামছে কলকাতা পুরসভা।