নিউজ ডেস্ক: সূর্য তখন মধ্যগগনে, মালদহের তাপমাত্রার পারদ ৪০ ডিগ্রি ছাড়িয়ে গিয়েছে। পলিথিনের ছাউনির তলায় গুমোট গরমে যখন প্রাণ ওষ্ঠাগত, তখন মালদহ কলেজের ডিস্ট্রিবিউশন সেন্টারে (DCRC) দেখা গেল এক অবিস্মরণীয় দৃশ্য। প্রখর রোদে সহকর্মীর কাঁধে ভর দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এগিয়ে চলছেন পঞ্চাশোর্ধ্ব এক মহিলা। দু’মাস আগে হওয়া ব্রেন স্ট্রোকের মারণ কামড়ে দুই পা কার্যত ক্ষমতা হারিয়েছে, কিন্তু হার মানেনি কর্তব্যবোধ। এবারের বিধানসভা নির্বাচনে মালদহের বীণা চক্রবর্তীই হয়ে উঠেছেন ভোটকর্মীদের জেদ ও নিষ্ঠার জীবন্ত প্রতীক।
অসুস্থ শরীরেও ডিউটির ডাক: ইংলিশবাজার শহরের বাসিন্দা বীণাদেবী মালদহ জেলা পরিষদের চতুর্থ শ্রেণির কর্মী। দু’মাস আগে স্ট্রোক হওয়ার পর থেকে কারও সাহায্য ছাড়া চলাফেরা করতে পারেন না তিনি। ইংলিশবাজারের ভোটার হওয়ায় তাঁর ডিউটি পড়েছে পাশের বিধানসভা কেন্দ্র মালদহে। তীব্র গরমে ঘেমে নেয়ে একাকার বীণাদেবী যখন যন্ত্রণায় কাতর, তখন তাঁর সহকর্মীরা তাঁকে ধরে ধরে একটু ঠান্ডা হাওয়ার সন্ধানে নিয়ে যাচ্ছিলেন। বীণাদেবী জানান, অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার পাওয়ার পর শারীরিক অবস্থার কথা জানিয়ে নাম কাটানোর আবেদন করেছিলেন তিনি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সুরাহা হয়নি।
‘রেহাই মেলেনি, তাই মাঠেই নামলাম’: যেখানে প্রতি বছর এক শ্রেণির সুস্থ-সবল কর্মী ভোটের ডিউটি এড়াতে নানা বাহানা বা প্রভাব খাটান, সেখানে বীণাদেবীর এই উপস্থিতি নজিরবিহীন। শরীরের যন্ত্রণা চেপে রেখেই তিনি বলেন, “ভোটের ডিউটি যখন পড়েছে, তখন যেভাবেই হোক কাজ করতেই হবে। রেহাই মেলেনি, তাই মাঠেই নামলাম।” তবে তাঁর আক্ষেপ, কোনও নির্দিষ্ট বুথ পেলে তাও বসার জায়গা নিশ্চিত হত, কিন্তু তাঁকে রাখা হয়েছে ‘রিজার্ভ’ ভোটকর্মী হিসেবে। অর্থাৎ, বুথে যাওয়ার পর কোনও কর্মী অসুস্থ হয়ে পড়লে বীণাদেবীকেই সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে হবে।
প্রশ্ন উঠছে প্রশাসনের মানবিকতা নিয়ে: প্রশাসন সূত্রে খবর, কোনও বুথে ভোটকর্মীর ঘাটতি মেটাতেই রিজার্ভ কর্মীদের রাখা হয়। কিন্তু বীণা চক্রবর্তীর মতো একজন স্ট্রোক-আক্রান্ত কর্মীকে, যাঁর নিজের চলাফেরার ক্ষমতা নেই, তাঁকে কেন রিজার্ভে রাখা হলো— তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অন্যান্য ভোটকর্মীরা। প্রখর গ্রীষ্মে এমন শারীরিক অবস্থা নিয়ে তিনি কীভাবে এই কঠিন দায়িত্ব সামলাবেন, তা নিয়ে সহকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়েছে। তবুও যন্ত্রণাকে সঙ্গী করেই মালদহ কলেজের তপ্ত চত্বরে নতি স্বীকার না করার শপথ নিয়েছেন এই লড়াকু নারী।