নিউজ ডেস্ক: টানা ১৭টি দীর্ঘ বছরের আইনি লড়াই এবং হতাশার মেঘ কাটিয়ে অবশেষে চন্দননগরের রায় পরিবারের মুখে ফুটল আনন্দের হাসি। দীর্ঘ আইনি জট কাটিয়ে শেষমেশ সরকারি চাকরির মুখ দেখতে চলেছেন পিতৃহারা যুবক আকাশরঞ্জন রায়।

ঘটনার সূত্রপাত ২০০৯ সালে। হুগলির গুড়াপ থানায় কর্মরত অবস্থায় হঠাৎই মারা যান রাজ্য পুলিশের কনস্টেবল বিকাশরঞ্জন রায়। সেই সময় নিয়ম অনুযায়ী মৃতের পরিবারের কোনো এক সদস্যের অনুকম্পার ভিত্তিতে (Compassionate Ground) চাকরি পাওয়ার আইনি অধিকার ছিল। কিন্তু বিকাশবাবুর আকস্মিক মৃত্যুর সময় তাঁর স্ত্রীর বয়স ছিল ৫২ বছর, আর ছেলে আকাশরঞ্জন ছিলেন নাবালক। স্বামীর মৃত্যুর ৬ মাসের মধ্যে পরিবারের অস্তিত্ব রক্ষার খাতিরে চাকরির আর্জি জানিয়ে আবেদন করেছিলেন মা। পরবর্তীতে ২০১৩ সালে ছেলে আকাশ সাবালক হতেই মা দাপ্তরিকভাবে ছেলের নাম চাকরির জন্য সুপারিশ করেন। কিন্তু এর পরেই শুরু হয় দীর্ঘ প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতা।

একবার রাজ্য সরকারের দপ্তর তো আর একবার স্টেট অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ট্রাইব্যুনাল (SAT)— টানা দৌড়ঝাঁপ করেও মেলেনি কোনো সুরাহা। পরবর্তীতে তিন সদস্যের একটি স্ক্রিনিং কমিটি আকাশকে চাকরি দেওয়ার জন্য সুপারিশ করলেও, ২০২২ সালে রাজ্য স্বরাষ্ট্র দপ্তর সেই সুপারিশ আচমকা নাকচ করে দেয়। স্বরাষ্ট্র দপ্তরের সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে প্রথমে ‘স্যাট’-এ মামলা করলেও সেখানে রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্তই বহাল রাখা হয়। কোনো উপায় না দেখে শেষমেশ কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন আকাশরঞ্জন।

সম্প্রতি কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি মধুরেশ প্রসাদ এবং বিচারপতি বিশ্বরূপ চৌধুরীর ডিভিশন বেঞ্চে এই স্পর্শকাতর মামলার শুনানি হয়। আদালতে আকাশের পক্ষে সওয়াল করে আইনজীবী সুশান্ত পাল জানান, অনুকম্পামূলক নিয়োগের নির্দেশিকা বা ‘কমপ্যাশনেট অ্যাপয়েন্টমেন্ট’-এর ১০(এএ) নম্বর ধারা অনুযায়ী এই মামলার নিষ্পত্তি হওয়া উচিত ছিল, যা রাজ্য করেনি। ওই নির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী, কোনো কর্মরত কর্মচারীর মৃত্যুর পর বিশেষ পরিস্থিতিতে পাঁচ বছর পর্যন্ত চাকরির জন্য আবেদন করা যায়। বিকাশবাবুর মৃত্যুর সময় পরিবারে চাকরি পাওয়ার মতো কেউ সক্ষম বা সাবালক ছিলেন না। ফলে ছেলে সাবালক হওয়ার পরই এই পদের জন্য সম্পূর্ণ যোগ্য হয়েছেন।

সরকারপক্ষের আর্জি ও বিরোধিতা খারিজ করে হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে, আকাশের দাবি সম্পূর্ণ আইনি ও যুক্তিযুক্ত। এর পরই আদালতের তরফে নির্দেশ দেওয়া হয় যে, আগামী আট সপ্তাহের মধ্যে রাজ্য সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে আকাশরঞ্জন রায়ের হাতে নিয়োগপত্র তুলে দিতে হবে। আদালতের এই ঐতিহাসিক রায়ে দীর্ঘ ১৭ বছর পর বিচার পেলেন প্রয়াত পুলিশকর্মীর পরিবার।

Share on Social Media