নিউজ ডেস্ক: উত্তরবঙ্গে লোকালয়ে বন্য হাতির হানা এবং তার জেরে হাতি-মানুষের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ঘটনা সম্পূর্ণ শূন্যে নামিয়ে আনতে এক বড়সড় ও অভিনব পরিকল্পনা নিল রাজ্য বনদপ্তর। আলিপুরদুয়ার ও কুমারগ্রাম ব্লকের বিস্তীর্ণ সীমান্ত এলাকায় এবার বসানো হতে চলেছে আধুনিক ‘ঝুলন্ত সোলার ফেন্সিং’ (Hanging Solar Fencing)। ইতিমধ্যেই বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের (BTR) রাজাভাতখাওয়া ও পানবাড়ি এলাকায় এই সোলার ফেন্সিংয়ের পাইলট প্রজেক্ট ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে। ওই দুই এলাকায় এখন লোকালয়ে হাতি ঢোকার ঘটনা যেমন শূন্যে ঠেকেছে, তেমনই হাতির মুখ থেকে রক্ষা পেয়েছে কৃষকদের বিঘার পর বিঘা জমির ফসল। একইভাবে মাঝেরডাবরি চা বাগান ও নিমতি এলাকাতেও এই ঝুলন্ত সোলার ফেন্সিং অত্যন্ত সফল হয়েছে।
এই প্রাথমিক সাফল্যের ওপর ভিত্তি করেই এবার বক্সার পূর্ব ডিভিশনের ভল্কা, খোঁয়ারডাঙা, মারাখাতা ও শিলটং বনবস্তি হয়ে মহাকালগুড়ি পর্যন্ত মোট ২৭ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে হাতি ঠেকাতে সোলারের ঝুলন্ত ফেন্সিং দেওয়ার মেগা পরিকল্পনা নিয়েছে বনদপ্তর। এর মধ্যে মহাকালগুড়ি এলাকাটি আলিপুরদুয়ার-২ ব্লকের অন্তর্গত এবং বাকি বিস্তীর্ণ এলাকাটি কুমারগ্রাম ব্লকের মধ্যে পড়ে।
রাজ্যের বনমন্ত্রী মনোজ ওরাওঁ এই বিষয়ে জানান, ‘‘এই ২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ ঝুলন্ত সোলার ফেন্সিং পরিকাঠামো তৈরি করতে সরকারের মোট ৬৫ লক্ষ টাকা খরচ হবে। শুধু বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পই নয়, আগামী দিনে মাদারিহাট ব্লকে থাকা জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যান লাগোয়া যে সমস্ত লোকালয় রয়েছে, সেখানেও হাতি ঠেকাতে আমরা এই ঝুলন্ত সোলার ফেন্সিং দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছি। মূলত মানুষের অসচেতনতার কারণেই হাতি এবং হাতির হামলায় মানুষের মৃত্যুর ঘটনা দিন দিন বাড়ছে। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো মানুষ ও বন্যপ্রাণের এই সংঘাতকে পুরোপুরি দূর করা।’’
উল্লেখ্য, সম্প্রতি কুমারগ্রামের ভল্কা এবং আলিপুরদুয়ারের শালকুমার এলাকায় চাষের জমিতে দেওয়া অবৈধ বিদ্যুৎবাহী তারে স্পৃষ্ট হয়ে দু’টি হাতির মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছিল। এর পাশাপাশি লোকালয়ে হাতির হামলায় মানুষের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছিল। এই ধরণের অনভিপ্রেত মৃত্যুর ঘটনা পুরোপুরি আটকাতেই এবার বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে বড় পরিসরে এই প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া হচ্ছে।
কীভাবে কাজ করে এই ঝুলন্ত সোলার ফেন্সিং?
বনদপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, এই ব্যবস্থায় প্রথাগত মাটির কাছাকাছি টানা তারের বেড়ার পরিবর্তে নির্দিষ্ট দূরত্বে উুঁচু খুঁটি পুঁতে সোলার বিদ্যুৎ পরিবাহী তার ওপর থেকে নিচের দিকে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। তারগুলি ঠিক হাতির শরীরের গড় উচ্চতা মেপে ঝোলানো থাকে, যাতে ছোট বন্যপ্রাণী বা মানুষ নিচে দিয়ে অনায়াসে যাতায়াত করতে পারে। লোকালয়ে ঢোকার মুখে হাতির পিঠে বা শুঁড়ে এই তার স্পর্শ করলেই সে একটি মৃদু বৈদ্যুতিক ধাক্কা বা ‘শক্’ (Mild Shock) খায়। এই সৌর বিদ্যুতের হালকা শকে হাতির কোনও শারীরিক ক্ষতি বা মৃত্যুর আশঙ্কা থাকে না। তবে হাতি তীব্র ভয় পেয়ে যায় এবং লোকালয় বা চাষের জমির দিকে যাওয়ার সাহস হারিয়ে পুনরায় গভীর জঙ্গলে ফিরে যায়। বনদপ্তরের এই আধুনিক পদক্ষেপে আশার আলো দেখছেন ডুয়ার্সের বাসিন্দারা।