নিউজ ডেস্ক: “সারারাত নাচাব, এনজয় করব!”— বৈধ টিকিট থাকা সত্ত্বেও ভুলবশত ট্রেনের ভেন্ডার কামরায় উঠে পড়ায় দুই যুবতী নৃত্যশিল্পী বোনকে এমনই চরম কুৎসিত ও আপত্তিকর মন্তব্য করার অভিযোগ উঠল এক রেল টিকিট পরীক্ষকের (TTE) বিরুদ্ধে। উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁ স্টেশনের এই নারকীয় হেনস্থার ঘটনায় তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে এলাকায়। এই নজিরবিহীন অপমানের প্রতিবাদে এবং অভিযুক্ত টিকিট পরীক্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে বনগাঁ জিআরপি (GRP) থানার সামনে ক্ষোভে ফেটে পড়েন স্থানীয় নৃত্যশিল্পী ও শিক্ষক-শিক্ষিকারা। থানার সামনে দীর্ঘক্ষণ বিক্ষোভ দেখান তাঁরা।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, গত শুক্রবার দুপুরে গোবরডাঙার বাসিন্দা দুই নৃত্যশিল্পী বোন আপ বনগাঁ লোকালে চড়ে বনগাঁ স্টেশনে পৌঁছন। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল সেখান থেকে ট্রেন ধরে রানাঘাটে নিজেদের নাচের স্কুলে যাওয়া। তাঁদের কাছে ভ্রমণের বৈধ টিকিট থাকা সত্ত্বেও, ভিড়ের জেরে বা ভুলবশত তাঁরা ট্রেনের ভেন্ডার কামরায় (Vendor Compartment) উঠে পড়েছিলেন। বনগাঁ স্টেশনে ট্রেন থেকে নামতেই এক টিকিট পরীক্ষক তাঁদের পথ আটকান এবং টিকিট দেখতে চান। যুবতীরা বৈধ টিকিট দেখালেও, কেন তাঁরা ভেন্ডার কামরায় উঠেছেন— এই অজুহাতে তাঁদের জোরপূর্বক রেলের টিকিট পরীক্ষকদের অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁদের কাছে আড়াই হাজার টাকা জরিমানা দাবি করেন ওই কর্মী।
ভুক্তভোগী দুই বোন জানান, তাঁরা অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য ক্ষমা চান এবং জানান যে এত টাকা জরিমানা দেওয়ার মতো সামর্থ্য এই মুহূর্তে তাঁদের নেই। অভিযোগ, এর পরেই ওই টিকিট পরীক্ষক নিজের রূপ বদলে চরম অভব্য আচরণ শুরু করেন। তিনি যুবতীদের পার্স কেড়ে নিয়ে নিজে টাকা খুঁজতে থাকেন। ব্যাগে নগদ টাকা না পেয়ে তিনি অনলাইনে টাকা মেটানোর জন্য চাপ দিতে থাকেন এবং তাঁদের মোবাইল ফোনটি কেড়ে নিয়ে অনলাইন পেমেন্টের অ্যাপ আছে কি না, তা পরীক্ষা করেন।
কোনোভাবেই টাকা উদ্ধার করতে না পেরে, অভিযুক্ত টিকিট পরীক্ষক যুবতীদের বাড়িতে যোগাযোগ করতে বলেন। সেই মতো তাঁরা নিজেদের মায়ের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করলে, তাঁদের মা অসহায়ভাবে টিকিট পরীক্ষককে অনুরোধ করেন, “মেয়েদের একটু বসিয়ে রাখুন, আমি যেভাবে হোক টাকা জোগাড় করে এসে ওদের নিয়ে যাচ্ছি।” অভিযোগ, মায়ের এই আকুতির জবাবেই ওই রেলকর্মী ফোনে অত্যন্ত কুরুচিকর ও যৌন হেনস্তামূলক মন্তব্য করে বসেন। তিনি বলেন, “টাকা লাগবে না, সারারাত নাচাব, এনজয় করব।”
এই কুৎসিত হুমকিতে চরম আতঙ্কিত ও ভীত হয়ে পড়েন দুই বোন। তাঁরা অফিসের মধ্যেই কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং কোনোক্রমে রানাঘাটের নাচের স্কুলের শিক্ষিকার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। অভিযোগ, ফোনে ওই শিক্ষিকা প্রতিবাদ করতে গেলে অভিযুক্ত রেলকর্মী তাঁর সঙ্গেও অত্যন্ত অভদ্র আচরণ করেন এবং তাঁর চরিত্র নিয়েও কু-মন্তব্য করেন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে যুবতীরা মোবাইলে ওই রেলকর্মীর কীর্তি ভিডিও করতে শুরু করলে, বেগতিক বুঝে ও ভয়ে অভিযুক্ত তাঁদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। এমনকি মোবাইল থেকে সেই ভিডিও মুছে ফেলার জন্য চরম চাপ সৃষ্টি করা হয় বলেও অভিযোগ।
এই ঘটনার বিষয়ে হেনস্থার শিকার এক নৃত্যশিল্পী জানান, “মায়ের সঙ্গে কথা বলার পর আমাদের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত নোংরা ইঙ্গিত করে ওই ব্যক্তি। একজন টিকিট পরীক্ষকের মুখ থেকে এমন কথা শুনে আমরা স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম।” ঘটনার প্রতিবাদে সরব হওয়া এক অভিভাবিকা বলেন, “একজন সরকারি কর্মচারীর কাছ থেকে নারীদের প্রতি এই ধরনের নোংরা মানসিকতা ও মন্তব্য কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আমরা ওঁর চাকরি থেকে বরখাস্ত ও কঠোর শাস্তি চাই।” রেল পুলিশ সূত্রে খবর, এই বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে এবং সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখে ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে জিআরপি।